শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায় ২০২২ সালের গণঅভ্যুত্থান। সেই সময়কার চরম উত্তেজনার মধ্যে একজন আইনপ্রণেতাকে (MP) পিটিয়ে হত্যার দায়ে ১২ জন বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) গাম্পাহা হাইকোর্টের তিন সদস্যের বিচারক বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। দীর্ঘ শুনানির পর সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে এই সাজা প্রদান করা হয়।
নিত্তাম্বুয়ায় সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ড: ঠিক কী ঘটেছিল?
তদন্তকারীদের দাখিল করা নথিতে দেখা যায়, ২০২২ সালের মে মাসে শ্রীলঙ্কার তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের আইনপ্রণেতা ৫৭ বছর বয়সী অমরকীর্তি আথুকোরালা নিত্তাম্বুয়া শহর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই সময় শত শত বিক্ষোভকারী তার গাড়ি আটকে দেয়। আত্মরক্ষার্থে আথুকোরালা বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালালে এক যুবক গুরুতর আহত হন। এরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
ক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে বাঁচতে আথুকোরালা পাশের একটি ভবনে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই প্রায় ৫ হাজার মানুষ সেই ভবনটি ঘিরে ফেলে। উত্তেজিত জনতা তাকে এবং তার দেহরক্ষীকে ভবন থেকে টেনে বের করে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, সেই ভিড়ের মধ্যেই কয়েকজন এই হত্যাকাণ্ড সরাসরি ত্বরান্বিত করেছিলেন।
আদালতের রায় ও আইনি পর্যবেক্ষণ
গাম্পাহা হাইকোর্টের বিচারকরা এই মামলায় মোট ৩৫ জন আসামিকে অভিযুক্ত করেছিলেন। এর মধ্যে ১২ জনকে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড (Death Sentence) দেওয়া হয়। বাকি ২৩ জন সন্দেহভাজনকে প্রমাণের অভাবে খালাস দিয়েছেন আদালত। তবে অভিযুক্তদের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court) আপিল করার পরিকল্পনা করছেন।
উল্লেখ্য, শ্রীলঙ্কায় দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কোনো অপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়নি। ১৯৭৬ সাল থেকে দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ওপর এক ধরনের অলিখিত স্থগিতাদেশ (Moratorium) রয়েছে। যদিও গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আদালত এখনো নিয়মিতভাবে এই সাজা দিয়ে আসছেন।
গণঅভ্যুত্থান ‘আরাগালায়া’ ও রাজাপাকসে পরিবারের পতন
শ্রীলঙ্কার এই বিক্ষোভ বা ‘আরাগালায়া’র মূল কারণ ছিল নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকট। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (Foreign Reserve) ফুরিয়ে আসায় খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দেয়। ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক ঋণে খেলাপি (Default) হওয়ার পর সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। বিক্ষোভের চরম পর্যায়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তার ভাই প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসেও গদি ছাড়েন। সেই সময় বিক্ষোভকারীরা সরকার দলীয় প্রায় ৭৫ জন এমপির বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
রাজাপাকসেদের পতনের পর রনিল বিক্রমাসিংহে আইএমএফ (IMF) থেকে ২.৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে বামপন্থি নেতা অনুরা কুমারা দিশানায়েকে জয়ী হন। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কৃচ্ছ্রসাধন নীতি (Austerity Measures) বহাল রেখে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন।
আইনপ্রণেতা হত্যা মামলার এই রায় শ্রীলঙ্কার বিচার ব্যবস্থায় একটি নজির হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এটি একই সাথে যেমন অপরাধের বিচার নিশ্চিত করেছে, তেমনি একটি দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির করুণ পরিণতির কথা পুনরায় মনে করিয়ে দিল।