একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমা ও রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মসনদে ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে পরবর্তী সরকার গঠন করতে যাচ্ছে দলটি। এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, দীর্ঘ ৩৫ বছর পর একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সমর্থনে আগামীর বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবেন বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান।
ফলাফল বিশ্লেষণ: ধানের শীষের জয়জয়কার
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২৮৯টির বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, বিএনপি ও তার মিত্র জোটের প্রার্থীরা ২১০টি আসনে বিজয় নিশ্চিত করেছেন। এই বিশাল ব্যবধানে জয় বিএনপিকে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাজিক ফিগার অনায়াসেই এনে দিয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ৭২টি আসনে জয়লাভ করে সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ছোট দলগুলোর প্রার্থীরা সব মিলিয়ে ৭টি আসনে জয় পেয়েছেন। একটি আসনের (শেরপুর-৩) নির্বাচন স্থগিত থাকায় সেটি বাদে বাকি সব আসনের চিত্র এখন স্পষ্ট।
৩৫ বছরের ঐতিহ্যে বদল: নতুন নেতৃত্বের যুগে পদার্পণ
তারেক রহমানের হাত ধরে বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মুখোমুখি। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার পতন পরবর্তী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই প্রথম কোনো পুরুষ প্রধানমন্ত্রী শপথ নিতে যাচ্ছেন। সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে এইচ এম এরশাদের আমলে কাজী জাফর আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে দুই নারী নেত্রী—বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে। এই দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের 'ফেমিনিন এরা' বা নারী নেতৃত্বের যুগের পর তারেক রহমানের অভিষেককে দেশের 'পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ'-এ একটি বড় ধরনের রূপান্তর হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ভোটের সমীকরণ ও তরুণদের রায়
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হওয়া এই ভোটযুদ্ধে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন দেশের ১২ কোটিরও বেশি ভোটার। ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে একযোগে ভোটগ্রহণ চলে। সকালের দিকে ভোটারদের উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। বিশেষ করে 'ফার্স্ট টাইম ভোটার' বা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ, 'Job Creation' এবং 'Digital Transformation'-এর প্রত্যাশায় তরুণরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
বিজয় উল্লাস নয়, সংযত উদযাপনের নির্দেশনা
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি বিশেষ বার্তা দিয়েছেন তারেক রহমান। জনমনে স্বস্তি বজায় রাখতে এবং কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে বিজয় মিছিল না করার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে বিএনপি। দলের প্রেস উইং জানিয়েছে, এই বিজয়কে মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা হিসেবে পালন করা হবে। আজ বাদ জুমা সারা দেশে শুকরিয়া ও বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়েও প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।
নির্বাচনের পরিসংখ্যান এক নজরে
এবারের নির্বাচনে মোট প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২৯ জন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দল মনোনীত প্রার্থী ছিল ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ২৭৪ জন। নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ থাকলেও শেষ পর্যন্ত বিজয়ীদের তালিকায় তাদের হার ছিল সীমিত। ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের এই বিশাল যজ্ঞে ১২৪টি দেশে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছিল, যা প্রবাসীদের অংশগ্রহণকেও নিশ্চিত করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই নতুন সরকার দেশের 'Market Value' বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন 'Global Standard' স্থাপন করতে সক্ষম হবে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।