পূর্ব এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার পারদ চড়িয়ে এবার জাপানি জলসীমায় একটি চীনা মাছ ধরার জাহাজ জব্দ করেছে টোকিও কর্তৃপক্ষ। গত বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) জাপানের বিশেষ সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল (Exclusive Economic Zone - EEZ) থেকে জাহাজটি আটক করার পাশাপাশি এর ক্যাপ্টেনকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০২২ সালের পর এই প্রথম কোনো চীনা নৌযান আটকের ঘটনা বেইজিং ও টোকিওর মধ্যে একটি বড় ধরনের ‘ডিপ্লোম্যাটিক স্ট্যান্ডঅফ’ (Diplomatic Standoff) তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নাগাসাকি উপকূলে নাটকীয় অভিযান
জাপানের মৎস্য সংস্থা (Fisheries Agency) জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিম নাগাসাকি প্রিফেকচারের কাছাকাছি জাপানি জলসীমায় অবৈধভাবে অবস্থান করছিল চীনা জাহাজটি। জাপানি পরিদর্শন কমান্ডের পক্ষ থেকে জাহাজটিকে তল্লাশির জন্য থামার নির্দেশ দেওয়া হলেও সেটি অমান্য করে দ্রুত পালানোর চেষ্টা করে। দীর্ঘক্ষণ ধাওয়া করার পর শেষ পর্যন্ত নৌযানটিকে নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয় জাপানি বাহিনী।
আটককৃত ৪৭ বছর বয়সী ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে সরকারি আদেশ অমান্য ও পালানোর চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। জাহাজটিতে ক্যাপ্টেন ছাড়াও আরও ১০ জন আরোহী ছিলেন। জাপানি সংবাদমাধ্যমগুলো এই নৌযানটিকে উচ্চ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন 'টাইগার নেট ফিশিং বোট' (Tiger Net Fishing Boat) হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা সাধারণত বড় আকারের মৎস্য শিকারের জন্য ব্যবহৃত হয়।
উত্তপ্ত কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট ও তাইওয়ান ইস্যু
এই আটকের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন তাইওয়ান ইস্যুতে চীন ও জাপানের সম্পর্ক ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে। সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, যদি চীন জোরপূর্বক তাইওয়ান দখলের চেষ্টা চালায়, তবে জাপান সেখানে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ (Military Intervention) করতে পারে।
তাকাইচির এই মন্তব্য বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করেছে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে চীন ইতোমধ্যে টোকিওতে নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে এবং চীনা নাগরিকদের জাপানে ভ্রমণ ও উচ্চশিক্ষার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে মাছ ধরার জাহাজ আটকের ঘটনাটি ‘আগুনে ঘি ঢালার’ মতো কাজ করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
জাপান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাহাজটির ক্যাপ্টেন তাঁর অপরাধ স্বীকার করেছেন কি না, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। তবে বেইজিং এখন পর্যন্ত এই নির্দিষ্ট ঘটনাটি নিয়ে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ চীন সাগর ও পূর্ব চীন সাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টাকে রুখতে জাপান এখন অনেক বেশি কঠোর অবস্থান (Hardline Stance) গ্রহণ করছে।
এই সামুদ্রিক বিরোধ কেবল মাছ ধরা বা জলসীমা লঙ্ঘনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি মূলত এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (Asia-Pacific Region) শক্তি প্রদর্শনের একটি অংশ। এই ঘটনার পর টোকিও ও বেইজিংয়ের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও কতটা সংকুচিত হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। একটি সাধারণ মাছ ধরার ট্রলারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ‘জিওপলিটিক্যাল ক্রাইসিস’ (Geopolitical Crisis) শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণে রয়েছে আন্তর্জাতিক মহল।