বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম হোয়াটসঅ্যাপের ওপর চূড়ান্ত খড়্গহস্ত হলো রাশিয়া। স্থানীয় আইন অমান্য এবং ক্রেমলিনের শর্তাবলি মানতে অস্বীকৃতি জানানোর অভিযোগে দেশটিতে মেটার (Meta) মালিকানাধীন এই অ্যাপটি পুরোপুরি ব্লক (Block) করে দেওয়া হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে তথ্যপ্রবাহের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা মস্কো শুরু করেছিল, এই নিষেধাজ্ঞা তারই একটি বড় অংশ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক টেক বিশ্লেষকরা।
বিকল্প হিসেবে ‘ম্যাক্স’ অ্যাপ: নাগরিক সেবা নাকি নজরদারি?
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিষেধাজ্ঞার কথা জানান। তিনি বলেন, রাশিয়ার সার্বভৌম আইন ও ডেটা সিকিউরিটি (Data Security) বিধিমালা মেনে চলতে মেটা বারবার অনীহা প্রকাশ করেছে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার নাগরিকদের জন্য বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্র-সমর্থিত ‘জাতীয় মেসেঞ্জার’ ম্যাক্স (Max) ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে সরকার।
মস্কোর দাবি, ‘ম্যাক্স’ অ্যাপে বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা যুক্ত করা হয়েছে, যা নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবন সহজ করবে। তবে ‘ডিজিটাল রাইটস’ কর্মীদের অভিযোগ, এই অ্যাপটি আসলে নাগরিকদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি (Surveillance) চালানোর একটি হাতিয়ার হতে পারে। ক্রেমলিন অবশ্য এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
মেটার সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও ‘উগ্রবাদ’ তকমা
রাশিয়া ও মার্কিনি টেক জায়ান্ট (Tech Giant) মেটার মধ্যকার সম্পর্ক অনেক আগেই তলানিতে ঠেকেছে। মস্কো ইতোমধ্যেই মেটাকে একটি ‘উগ্রবাদী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এর আগে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও যোগাযোগে সাধারণ মানুষের অতি-নির্ভরশীলতার কারণে হোয়াটসঅ্যাপকে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে নিজস্ব ও নিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বার্থে এই শেষ জনপ্রিয় অ্যাপটিও বন্ধ করে দিল পুতিন প্রশাসন।
১০ কোটি ব্যবহারকারী ও ভিপিএন যুদ্ধের নতুন অধ্যায়
হোয়াটসঅ্যাপ কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে রাশিয়ার এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের দাবি, রাশিয়ায় প্রায় ১০ কোটিরও বেশি ব্যবহারকারী এই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করেন। সরকার তাদের একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অ্যাপ ব্যবহারে বাধ্য করতে নিরাপদ ও ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড’ (End-to-End Encrypted) যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত করছে।
বর্তমানে রাশিয়ার ভেতরে হোয়াটসঅ্যাপের মূল সার্ভারগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা এখন ভিপিএন (Virtual Private Network) ব্যবহার করা ছাড়া এই অ্যাপটিতে প্রবেশ করতে পারছেন না। রাশিয়ার যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘রসকোমনাদজর’ (Roskomnadzor) কঠোরভাবে ডেটা ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ করছে এবং ক্রমান্বয়ে ভিপিএন সেবার ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করছে।
টেলিগ্রাম কি নিরাপদ বিকল্প?
হোয়াটসঅ্যাপ ব্লক হওয়ার পর রাশিয়ার বিশাল এক জনগোষ্ঠী এখন বিকল্প হিসেবে টেলিগ্রামের (Telegram) দিকে ঝুঁকছেন। যদিও টেলিগ্রাম রাশিয়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয়, তবুও অভিযোগ রয়েছে যে এই প্ল্যাটফর্মটিও রুশ নিয়ন্ত্রকদের গভীর নজরদারির বাইরে নয়। ইউটিউব, স্ন্যাপচ্যাট এবং অন্যান্য পশ্চিমা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো আগেই সীমিত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া আসলে একটি ‘সার্বভৌম ইন্টারনেট’ (Sovereign Internet) ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে বাইরের কোনো টেক কোম্পানির হস্তক্ষেপ থাকবে না। হোয়াটসঅ্যাপের ওপর এই সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞা বিশ্বজুড়ে ‘ডিজিটাল ফ্রেটম্যান্টেশন’ বা ইন্টারনেটের বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে তুলল।