• আন্তর্জাতিক
  • পান্নুন হত্যাচেষ্টা: নিউইয়র্কের আদালতে দায় স্বীকার ভারতীয় নাগরিক নিখিল গুপ্তের, নেপথ্যে বড় ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত?

পান্নুন হত্যাচেষ্টা: নিউইয়র্কের আদালতে দায় স্বীকার ভারতীয় নাগরিক নিখিল গুপ্তের, নেপথ্যে বড় ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত?

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
পান্নুন হত্যাচেষ্টা: নিউইয়র্কের আদালতে দায় স্বীকার ভারতীয় নাগরিক নিখিল গুপ্তের, নেপথ্যে বড় ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত?

ভাড়াটে খুনিকে অর্থ প্রদান থেকে শুরু করে এক পলাতক সরকারি কর্মকর্তার নির্দেশ— চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তিতে ফাঁস হলো পান্নুন হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য আখ্যান; ২০ থেকে ২৪ বছরের কারাদণ্ডের মুখে ৫৪ বছর বয়সী এই ভারতীয় নাগরিক।

আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও গোয়েন্দা লড়াইয়ের এক চরম নাটকীয় মোড় প্রত্যক্ষ করল নিউইয়র্কের আদালত। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা এবং ‘শিখস ফর জাস্টিস’ (SFJ) সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন ভারতীয় নাগরিক নিখিল গুপ্ত। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে তিনি এই জবানবন্দি দেন, যা দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

আদালতে চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি ও ‘হিটম্যান’ বিতর্ক ৫৪ বছর বয়সী নিখিল গুপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট বিচারক সারাহ নেটবার্নের সামনে স্বীকার করেন যে, ২০২৩ সালে তিনি পান্নুনকে হত্যার উদ্দেশ্যে একজন ‘Hitman’ বা পেশাদার খুনি ভাড়া করার প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তিনি জানান, এই কাজের জন্য তিনি ভারত থেকে অনলাইনে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার অগ্রিম পাঠিয়েছিলেন। তবে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ার মতো তথ্য হলো, নিখিল গুপ্ত যাকে ‘হিটম্যান’ ভেবেছিলেন, তিনি ছিলেন মার্কিন মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ‘Drug Enforcement Administration’ (DEA)-এর একজন ছদ্মবেশী গোপন সোর্স।

নেপথ্যে কে? পলাতক কর্মকর্তার নাম প্রকাশ মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই (FBI)-এর নিউইয়র্ক অফিসের প্রধান জেমস সি বার্নাকল জানিয়েছেন, নিখিল গুপ্ত একা এই কাজ করেননি। তিনি মূলত ভারতের একজন সরকারি কর্মকর্তার নির্দেশে এই হত্যার ছক সাজিয়েছিলেন। মার্কিন চার্জশিটে বা অভিযোগপত্রে ওই কর্মকর্তার নাম বিকাশ যাদব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে বিকাশ যাদব পলাতক এবং এফবিআই-এর খাতায় তাকে ‘Wanted’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

নিখিলের আইনজীবী জে ক্লেটন আদালতের বাইরে মন্তব্য করেন, “নিখিল গুপ্ত ভেবেছিলেন দেশের বাইরে বসে কেবল একজনের মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার (Freedom of Speech) কেড়ে নিতে তাকে হত্যা করলেও আইনের হাত থেকে তিনি রেহাই পাবেন। কিন্তু তিনি ভুল ছিলেন।”

কে এই গুরপতবন্ত সিং পান্নুন? যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক পান্নুন পেশায় একজন আইনজীবী এবং খালিস্তান আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ। ২০০৯ সাল থেকে তিনি শিখস ফর জাস্টিস সংগঠনের জেনারেল কাউন্সেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাঞ্জাবকে ভারত থেকে আলাদা করে একটি স্বাধীন ‘খালিস্তান’ রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে তিনি আন্তর্জাতিক মহলে লবিং ও প্রচার চালিয়ে আসছেন। ভারত সরকার তাকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং তার সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র তাকে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সুরক্ষা দিয়ে আসছে।

প্রাগ থেকে নিউইয়র্ক: আইনি লড়াই ও সম্ভাব্য সাজা ২০২৩ সালের জুনে চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগ বিমানবন্দর থেকে নিখিল গুপ্তকে আটক করা হয় এবং পরে মার্কিন অনুরোধে তাকে ‘Extradition’ বা প্রত্যর্পণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়। তিনি মূলত ‘Murder-for-hire’ (ভাড়ায় হত্যা) এবং ‘Money Laundering’ (অর্থপাচার) সংক্রান্ত ষড়যন্ত্রের অপরাধ স্বীকার করেছেন। আদালতের আইনি গাইডলাইন অনুযায়ী, আগামী ২৯ মে সাজা ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছে, যেখানে তার ২০ থেকে ২৪ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

প্রতিক্রিয়া ও বিক্ষোভ মামলার শুনানির সময় আদালতের বাইরে শত শত শিখ সমর্থক জড়ো হয়ে ‘খালিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেন। অন্যদিকে, এক সাক্ষাৎকারে পান্নুন নিজেকে একজন ‘মানবাধিকার আইনজীবী’ দাবি করে বলেন, তিনি তার আন্দোলন থেকে পিছিয়ে যাবেন না। নিখিল গুপ্তকে তিনি এই ষড়যন্ত্রের একটি সাধারণ ‘প্যাঁদ’ বা ‘Soldier’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন যে, এই ষড়যন্ত্রের মূল হোতা ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। যদিও নয়া দিল্লি বরাবরই রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ধরণের কোনো ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

এই মামলার রায় কেবল নিখিল গুপ্তের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার গোয়েন্দা সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের সমীকরণকেও বড় ধরণের পরীক্ষার মুখে ফেলবে।

Tags: new york diplomatic tension assassination plot us court fbi investigation legal news khalistan movement pannun case nikhil gupta indian government