বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের আকাশে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। যার কণ্ঠের মাদকতা আর আধুনিক গায়কী তরুণ প্রজন্মকে শিখিয়েছিল কীভাবে সুরের প্রেমে পড়তে হয়। তিনি আর কেউ নন, মাইলস (Miles) ব্যান্ডের প্রবাদপ্রতিম ভোকাল ও বেজ গিটারিস্ট (Bass Guitarist) শাফিন আহমেদ। আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভালোবাসা দিবসের এই বিশেষ দিনে গুণী এই শিল্পীর ৬৫তম জন্মবার্ষিকী। এটিই তাঁর প্রথম জন্মদিন, যা তিনি নেই এই পৃথিবীতে।
সংগীতের উত্তরাধিকার ও ‘মনোজিৎ’ থেকে ‘শাফিন’ শাফিন আহমেদের ধমনীতে বইত সংগীতের শুদ্ধ ধারা। তিনি উপমহাদেশের প্রখ্যাত নজরুলসংগীত শিল্পী ফিরোজা বেগম এবং প্রথিতযশা সংগীতজ্ঞ কমল দাশগুপ্তের সন্তান। ১৯৬১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর পারিবারিক নাম রাখা হয়েছিল মনোজিৎ দাশগুপ্ত। তবে দেশভাগের পর সপরিবারে ঢাকায় থিতু হওয়ার সময় স্কুলে ভর্তির সুবিধার্থে তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মোহাম্মদ শাফিন আহমেদ। পরিবারের ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি ‘মুনা’ নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন।
‘মাইলস’ ও বাংলা ব্যান্ড মিউজিকের বিপ্লব শৈশব থেকেই বাবা-মায়ের সান্নিধ্যে উচ্চাঙ্গসংগীত ও নজরুলসংগীতের তালিম নিলেও শাফিনের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল পাশ্চাত্য সংগীত (Western Music)। বড় ভাই হামিন আহমেদের সঙ্গে ইংল্যান্ডে পড়াশোনার সময় তিনি ব্লুজ এবং রক মিউজিকের প্রতি আকৃষ্ট হন। দেশে ফিরে গড়ে তোলেন আইকনিক ব্যান্ড ‘মাইলস’। মাইলস-এর প্রধান গায়ক এবং বেজ গিটারিস্ট হিসেবে তিনি বাংলা ব্যান্ড মিউজিকে এক নতুন ধারা প্রবর্তন করেন। তাঁর গায়কী ও শৈলী কেবল বাংলাদেশ নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের কাছেও মাইলস-কে একটি ব্র্যান্ডে পরিণত করে।
কালজয়ী সৃষ্টি ও একক ক্যারিয়ার ব্যান্ডের বাইরেও শাফিন আহমেদের একটি সফল একক ক্যারিয়ার (Solo Career) ছিল। তাঁর কণ্ঠে ‘চাঁদ তারা সূর্য’, ‘জ্বালা জ্বালা’, ‘ফিরিয়ে দাও’, ‘ফিরে এলে না’ কিংবা ‘আজ জন্মদিন তোমার’—গানগুলো এখন বাংলা সংগীতের একেকটি ধ্রুপদী বা ক্লাসিক (Classic) সৃষ্টি। প্রতিটি কনসার্টে শাফিন আহমেদের উপস্থিতি মানেই ছিল তারুণ্যের জোয়ার। মিউজিক ভিডিওর যুগেও তাঁর প্রতিটি কাজ ছিল অত্যন্ত রুচিশীল এবং আধুনিক।
রাজনীতির ময়দান ও শেষ বিদায় সংগীতের পাশাপাশি জীবনের শেষ কয়েক বছর শাফিন আহমেদ সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন। ২০১৭ সালে তিনি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে (NDM) যোগ দেন এবং পরবর্তীতে ২০১৮ সালে জাতীয় পার্টিতে যুক্ত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৪ সালের ২৪ জুলাই সংগীতপ্রেমীদের কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান সুরের এই বরপুত্র। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় একটি কনসার্টে অংশ নিতে গিয়ে হৃদরোগে (Heart Attack) আক্রান্ত হন তিনি। দীর্ঘ লড়াই শেষে ৬৩ বছর বয়সে সেখানেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই লেজেন্ড।
আজ তাঁর জন্মদিনে ভক্ত-অনুরাগী ও সহকর্মীরা পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন তাঁকে। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর অমর সৃষ্টি ও কণ্ঠের জাদুময়তা চিরকাল বেঁচে থাকবে বাঙালির হৃদয়ে।