ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে থামছেই না দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর নৃশংসতা। একদিকে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ক্রমাগত হামলা চালিয়ে শান্তিচুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করা হচ্ছে, অন্যদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে সশস্ত্র অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের (Illegal Settlers) মদত দিয়ে এক অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করেছে তেল আবিব। সাম্প্রতিক এই সহিংসতায় পশ্চিম তীরে অন্তত ৫৪ জন ফিলিস্তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করেছে যে, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির (Ceasefire Agreement) দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের তাণ্ডব
স্থানীয় সময় শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) অধিকৃত পশ্চিম তীরের তালফিত ও তুরমুস আইয়া এলাকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চড়াও হয় ইসরায়েলি উগ্রপন্থীরা। অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা স্থানীয়দের ঘরবাড়ি লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ এবং সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জীবিকার প্রধান উৎস জলপাই গাছগুলো নির্বিচারে উপড়ে ফেলে। এই বর্বরোচিত হামলায় অর্ধশতাধিক ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। জাতিসংঘের (UN) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত অধিকৃত এই ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্লেষকরা একে সরাসরি ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
থমকে আছে গাজা পুনর্গঠন ও দ্বিতীয় ধাপের চুক্তি
গাজায় চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিষ্ঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ (Board of Peace)-এর তৎপরতাও এখন বাধার সম্মুখীন। কাউন্সিলের প্রভাবশালী সদস্য নিকোলাই ম্লাদেনোভ জানিয়েছেন, ইসরায়েলের অনবরত হামলা ও উস্কানির কারণে গাজা পুনর্গঠন কমিটি (Reconstruction Committee) তাদের মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করতে পারছে না। চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের প্রধান শর্ত ছিল হামাসের নিরস্ত্রীকরণ (Demilitarization) এবং সেখানে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী (International Security Force) মোতায়েন। কিন্তু ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ না হওয়ায় কোনো পক্ষই এগোতে পারছে না। ম্লাদেনোভের মতে, মিশরে কমিটির সদস্যরা আলোচনা করলেও গাজায় ঢোকার মতো নিরাপদ পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি।
মাহমুদ আব্বাসের কূটনৈতিক আর্তনাদ
আফ্রিকান ইউনিয়ন সম্মেলনে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ইসরায়েলি একগুঁয়েমির কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট অভিযোগ করেন, তেল আবিব সুপরিকল্পিতভাবে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে। আব্বাস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, গাজায় প্রশাসনিক কমিটিকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে এবং গাজা ও পশ্চিম তীরকে একটি একক শক্তিশালী প্রশাসনের (Unified Administration) অধীনে আনতে হবে। অন্যথায় এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি বনাম ধ্বংসস্তূপের বাস্তবতা
গাজা পুনর্গঠনের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ আন্তর্জাতিক তহবিল সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) এবং যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ১০০ কোটি ডলারের বেশি আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের ধ্বংসলীলা কাটিয়ে গাজাকে পুনরায় বসবাসের উপযোগী করতে প্রয়োজন অন্তত ৫০ বিলিয়ন ডলার। বোর্ডের নীতি অনুযায়ী, যারা এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন করবে, তারা এই বোর্ডে স্থায়ী সদস্যপদ লাভ করবে। তবে রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে ইউরোপের বেশ কিছু শক্তিশালী রাষ্ট্র এই উদ্যোগে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা তহবিল সংগ্রহের গতিকে মন্থর করে দিতে পারে।
ইসরায়েলের এই দ্বিমুখী আগ্রাসন যদি বন্ধ না হয়, তবে কেবল ফিলিস্তিন নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে বলে আশঙ্কা করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।