• বিনোদন
  • সুরের মায়ায় আজও অমলিন ‘গীতশ্রী’: কিংবদন্তি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের চতুর্থ প্রয়াণ দিবসে কোটি ভক্তের শ্রদ্ধা

সুরের মায়ায় আজও অমলিন ‘গীতশ্রী’: কিংবদন্তি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের চতুর্থ প্রয়াণ দিবসে কোটি ভক্তের শ্রদ্ধা

বিনোদন ১ মিনিট পড়া
সুরের মায়ায় আজও অমলিন ‘গীতশ্রী’: কিংবদন্তি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের চতুর্থ প্রয়াণ দিবসে কোটি ভক্তের শ্রদ্ধা

গ্রামোফোনের ধ্রুপদী যুগ পেরিয়ে ডিজিটাল স্ট্রিমিং—সাত দশকের সুরের জাদুতে প্রজন্মের সেতুবন্ধন হয়ে আছেন এই কালজয়ী কোকিলকণ্ঠী।

বাংলা গানের ‘সোনালি যুগ’ (Golden Era) মানেই এক মায়াবী কণ্ঠের আবেশ, যা মুহূর্তেই শ্রোতাকে নিয়ে যায় নস্টালজিয়ার অতল গহ্বরে। "এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো"— রোমান্টিক ঘরানার (Romantic Genre) এই একটি গানই যথেষ্ঠ যার কণ্ঠকে অমরত্ব দেওয়ার জন্য, তিনি আর কেউ নন, সুরসম্রাজ্ঞী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি, তাঁর চলে যাওয়ার চার বছর পূর্ণ হলো। প্রযুক্তির বিবর্তনে গ্রামোফোনের ডিস্ক থেকে গান আজ ‘স্পটিফাই’ (Spotify) কিংবা ইউটিউবের প্লে-লিস্টে জায়গা করে নিয়েছে, কিন্তু সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সুরেলা আবেদন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও আধুনিক।

ধ্রুপদী তালিম ও ‘গীতশ্রী’ হয়ে ওঠা

শৈশব থেকেই শাস্ত্রীয় সংগীতে (Classical Music) গভীর অনুরাগী ছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। ওস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁর যোগ্য শিষ্যা হিসেবে তিনি আয়ত্ত করেছিলেন সুরের সূক্ষ্ম কারুকাজ। তাঁর অসামান্য গায়নশৈলীর স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেছিলেন সম্মানজনক ‘গীতশ্রী’ খেতাব। ধ্রুপদী ঘরানা থেকে শুরু করে ছায়াছবির আধুনিক গান—সবখানেই তাঁর ছিল অনায়াস বিচরণ। ১৯৪৮ সালে ‘অঞ্জন গড়’ সিনেমার মাধ্যমে তাঁর ‘প্লেব্যাক’ (Playback) ক্যারিয়ার শুরু হয়। এরপর বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের কয়েক হাজার গানে কণ্ঠ দিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এক অনন্য উচ্চতায়। বিশেষ করে মহানায়ক উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন জুটির পর্দায় সন্ধ্যার কণ্ঠ ছিল এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মুক্তিযুদ্ধে অকৃত্রিম অবদান ও বাংলাদেশের প্রতি টান

শিল্পীসত্তার বাইরেও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন মানবতাবাদী ও লড়াকু ব্যক্তিত্ব। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের (War of Liberation) সময় তিনি পরম মমতা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এদেশের মানুষের পাশে। শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত লক্ষ লক্ষ মানুষের সহায়তায় অর্থ সংগ্রহ করতে তিনি রাজপথে নেমে গণআন্দোলনে অংশ নেন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত সুরকার সমর দাসের সাথে মিলে রেকর্ড করেন একাধিক উদ্দীপনামূলক ‘দেশাত্মবোধক গান’ (Patriotic Songs)। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাঁর গাওয়া গানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের জুগিয়েছিল অসীম প্রেরণা। বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে তাঁর নাম তাই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে চিরকাল।

শেষ ইচ্ছায় ছিল সেই চিরচেনা সুর

২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারি শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এই বর্ষীয়ান শিল্পী। পরবর্তীতে তিনি ‘কোভিড-১৯’ (COVID-19) পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হন। ফুসফুসের সংক্রমণ (Lung Infection) ও বার্ধক্যজনিত বহুমুখী সমস্যায় ভুগে ৯ মে ৯০ বছর বয়সে সুরের মায়া কাটিয়ে চিরবিদায় নেন তিনি। জানা যায়, মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি শেষবারের মতো শুনতে চেয়েছিলেন তাঁরই গাওয়া সেই বিখ্যাত গানটি— "এই শহর থেকে আরও অনেক দূরে, চলো কোথাও চলে যাই"। ১৫ ফেব্রুয়ারির এই দিনে তিনি সত্যিই শহর থেকে অনেক দূরে পাড়ি জমিয়েছিলেন, তবে রেখে গেছেন তাঁর কালজয়ী সুরের ঐশ্বর্য।

প্রজন্মান্তরে অমলিন সৃষ্টি

‘মধুমালতী ডাকে আয়’, ‘ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা’, ‘এ মাধবী রাত’, ‘এ শুধু গানের দিন’, ‘হয়তো কিছুই নাহি পাবো’— সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের এমন অসংখ্য গান আজও বাঙালির প্রেম-বিরহ আর একাকীত্বের পরম সঙ্গী। বর্তমানের ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’ (Digital Platform) কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া ‘রিলস’-এও তাঁর গানের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে, প্রকৃত সুরের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় কেবল একজন গায়িকা নন, তিনি বাংলা সংগীতের আকাশের এক উজ্জ্বল ও অনিবার্য নক্ষত্র, যার দ্যুতি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পথ দেখাবে।

Tags: playback singer music legend bengali music death anniversary liberation war classical music indian music sandhya mukhopadhyay romantic songs golden era