প্রথমবারের মতো নতুন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়। এদিকে ইতিহাস থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে এবার নতুন সরকারের শপথ বঙ্গভবনের বাইরে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।
এদিন শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে জোরদার করা হচ্ছে দক্ষিণ প্লাজার পাশাপাশি পুরো সংসদ ভবন এলাকায়।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে পরিচ্ছন্ন কর্মীদেরও। সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। প্রয়োজনে অন্য কোনো স্থানে অতিরিক্ত ক্যামেরা স্থাপন করলেও সেগুলোর মনিটরিং করছেন নিরাপত্তায় নিয়োজিত দায়িত্বশীলরা। এছাড়া সংসদ ভবন এলাকায় সব সময় গোয়েন্দা পুলিশ ডিউটি করে থাকে পাশাপাশি শপথ অনুষ্ঠান কেন্দ্র করে গোয়েন্দা পুলিশের বাড়তি নজরদারিতে ঢাকা আছে পুরো সংসদ ভবন এলাকা, এমনটাই জানিয়েছেন একটি সূত্র পাশাপাশি অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীরা তো আছেই।
শপথ অনুষ্ঠানস্থল সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ব্যাপক প্রস্তুতি লক্ষ্য করা যায়
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সংসদ ভবন এলাকাজুড়ে ছিল ব্যাপক কর্মব্যস্ততা। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে ভবনের ভেতরে ও বাইরে চলছে জোরদার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রস্তুতি। দক্ষিণ প্লাজা এলাকায় নতুন করে বসানো হচ্ছে সিসি ক্যামেরা, যা স্থাপনের কাজে র্যাব–এর সদস্যদের সক্রিয়ভাবে কাজ করতে দেখা যায়। একই সঙ্গে দক্ষিণ প্লাজার সামনে দেশীয় গণমাধ্যমকর্মীদের পাশাপাশি বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদেরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
সংসদ ভবনের ভেতরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, রংমিস্ত্রি ও ইলেকট্রিশিয়ানরা একযোগে কাজ করে যাচ্ছেন। দক্ষিণ প্লাজার সামনে কর্মরত ইলেকট্রিশিয়ান মোহাম্মদ করিম জানান, শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এখানে একাধিক জায়ান্ট স্ক্রিন টিভি বসানো হচ্ছে। তিনি বলেন, টিভিগুলোর ফ্রেম তৈরির কাজ করছি আমরা। আশা করছি, রাতের মধ্যেই সব কাজ শেষ করতে পারব। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই জনতা সংসদ ভবন এলাকায় প্রবেশ করে এবং ভবনের কয়েকটি স্থানে ভাঙচুর ও তাণ্ডবের ঘটনা ঘটে।
সেই ঘটনার পর আবারও জাতীয় সংসদ ভবন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনায় কোলাহল ও ব্যস্ততায় মুখর হতে চলেছে। জাতীয় সংসদ ভবনের ১২ নম্বর গেটের দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্য দীপঙ্কর বাংলানিউজকে বলেন, নতুন সরকারের শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে দেশের সব সদস্যরা এখানে একযোগে কাজ করছেন।
লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির বিজয়ী সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথের স্থান পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, শপথ গ্রহণসহ সংসদীয় কার্যক্রম সংবিধান অনুযায়ীই সম্পন্ন হবে। এ নিয়ে অযথা বিভ্রান্তি বা ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ নেই। সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান জানিয়ে দল ও নির্বাচিত সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।
এ্যানি আরও বলেন, সংসদ দেশের মানুষের আমানত। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং তাদের অধিকার রক্ষাই হবে মূল লক্ষ্য। একটি উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে সংসদের কার্যক্রম পরিচালিত হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মন্ত্রিপরিষদের আকার ও ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে দলীয় ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। শপথের পর সংসদীয় নেতা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবেন বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব হলো দেশের স্বার্থে কাজ করা। গণতন্ত্র, সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই নতুন সংসদ এগিয়ে যাবে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরীকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে ও খুদেবার্তা দিয়ে তার কোনো সাড়া মেলেনি।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, আগামীকাল সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের শপথগ্রহণ কেন্দ্র করে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে সংসদ এলাকায়। এছাড়াও আলাদা ট্র্যাফিক ব্যবস্থা থাকবে। ডিএমপি সব ইউনিট কাজ করবে এদিন।
জানা যায়, মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের শপথ পড়াবেন। শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারত, পাকিস্তান সার্কভুক্তসহ ১৩টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। একই দিন সকাল ১০টায় শপথ নেবেন নবনির্বাচিত ২৯৭ জন সংসদ সদস্য। তাদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।
এদিকে ইতিহাস থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে এবার নতুন সরকারের শপথ বঙ্গভবনের বাইরে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে সেখানে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেবে। মন্ত্রিসভার আগে এদিন সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ নেবেন নতুন সংসদ সদস্যরাও।
নতুন সরকারকে সাধারণত রাষ্ট্রপতি শপথবাক্য পাঠ করান এবং স্বাধীনতার পর থেকে তা বঙ্গভবনেই হয়ে আসছে। এবার স্থান বদলের মাধ্যমে সেই রীতি ভাঙতে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নেয় মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়। সেই সরকারকে অস্থায়ী সরকারও বলা হয়। এরপর স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়লাভের পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি শপথ নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম সরকার। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সেদিন শপথ নেন মন্ত্রিসভার আরও ১১ সদস্য। ঐতিহাসিক সেই শপথ হয় বঙ্গভবনে, শপথ পড়ান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।