• দেশজুড়ে
  • সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে চাঁদপুরের ৫০ গ্রামে বুধবার থেকে রোজা শুরু: ৯৬ বছরের ঐতিহ্যে অটল সাদ্রা দরবার

সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে চাঁদপুরের ৫০ গ্রামে বুধবার থেকে রোজা শুরু: ৯৬ বছরের ঐতিহ্যে অটল সাদ্রা দরবার

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে চাঁদপুরের ৫০ গ্রামে বুধবার থেকে রোজা শুরু: ৯৬ বছরের ঐতিহ্যে অটল সাদ্রা দরবার

মঙ্গলবার রাতে তারাবির নামাজ ও সেহরির মাধ্যমে মাহে রমজানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করছেন হাজারো ধর্মপ্রাণ মানুষ; ১৯২৮ সাল থেকে চলে আসা এই রীতির নেপথ্যে চন্দ্র মাসের বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিলেন অনুসারীরা।

দেশের মূল ভূখণ্ডের সাধারণ পঞ্জিকার একদিন আগেই পবিত্র মাহে রমজানের সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে চাঁদপুরের অর্ধশত গ্রামে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে মিল রেখে আগামীকাল বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে এসব গ্রামে শুরু হচ্ছে পবিত্র সিয়াম সাধনা। মঙ্গলবার রাতে মসজিদে মসজিদে তারাবির নামাজ আদায় এবং ভোররাতে সেহরি খাওয়ার মাধ্যমে গ্রামবাসী তাদের রোজা পালনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করবেন।

ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার ও ৯৬ বছরের পথচলা

চাঁদপুরের এই বিশেষ জনপদে একদিন আগে রোজা ও ঈদ উদযাপনের এই ধারা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি এক দীর্ঘস্থায়ী ‘Legacy’। স্থানীয় সূত্রমতে, ১৯২৮ সালে হাজীগঞ্জ উপজেলার সাদ্রা দরবার শরীফের তৎকালীন পীর, প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মরহুম মাওলানা ইসহাক (র.) এই রীতির প্রবর্তন করেন। তার যুক্তি ছিল, ইসলামি বিধান অনুযায়ী চন্দ্র মাস বা ‘Lunar Calendar’ সারা বিশ্বের জন্য অভিন্ন হওয়া উচিত। সেই থেকে প্রায় ৯৬ বছর ধরে সাদ্রা দরবারের অনুসারীরা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সংহতি রেখে ধর্মীয় উৎসবগুলো পালন করে আসছেন।

ফরিদগঞ্জ উপজেলার টোরা মুন্সিরহাটের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন মামুন মঙ্গলবার রাত সাড়ে নয়টায় এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, তাদের এই বিশ্বাসের মূলে রয়েছে বিশ্বজনীন ইসলামি ঐক্যের চেতনা।

ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও যৌক্তিকতা

সাদ্রা দরবার শরীফের বর্তমান পীরজাদা মুফতি আরিফ চৌধুরী এই প্রথার পক্ষে জোরালো ধর্মীয় ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, "আমরা কেবল সৌদি আরবকে অন্ধভাবে অনুসরণ করছি না, বরং বাস্তবতার নিরিখে চন্দ্র মাসের হিসাব করে রোজা পালন করছি। এটি কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নয়, বরং নিখুঁত হিসাবের ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপ।"

একই বংশের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব মাওলানা আবু ইয়াহিয়া মো. জাকারিয়া আল মাদানী জানান, তার পিতা মাওলানা ইসহাক (র.) অত্যন্ত বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন এবং গভীর ধর্মীয় জ্ঞান থেকেই তিনি ১৯২৮ সালে এই ধারা চালু করেন। আজ কেবল চাঁদপুরের গ্রামগুলোতেই নয়, দেশের আরও অনেক স্থানে তার এই দর্শনের অনুসারীরা একইভাবে উৎসব পালন করছেন।

ভৌগোলিক বিস্তার ও সামাজিক প্রস্তুতি

চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ ছাড়াও ফরিদগঞ্জ, মতলব উত্তর ও শাহরাস্তি উপজেলার অন্তত ৫০টি গ্রামে এই আগাম রোজা পালনের নিয়ম কার্যকর রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রামগুলো হলো— সাদ্রা, সমেশপুর, অলিপুর, বড়কুল, বেলচো, শিলাস্তলী ও বদরপুর।

ফরিদগঞ্জ উপজেলার বদরপুর গ্রামের মাওলানা শরীফউদ্দিন চৌধুরী জানান, সৌদি আরবে চাঁদ দেখার খবর নিশ্চিত হওয়ার পরপরই তারা স্থানীয় মসজিদে তারাবির নামাজের জামাতের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। অন্যদিকে, টোরা মুন্সিরহাট বাজার জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি ও প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক শামছুল আরেফিন জানান, পবিত্র রমজানের ভাবগাম্ভীর্য ও পবিত্রতা রক্ষায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বজনীন সংহতি বনাম স্থানীয় রীতিনীতি

যদিও বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে রোজা শুরু করেন, তবে চাঁদপুরের এই গ্রামগুলোতে ‘Global Alignment’ বা বিশ্বজনীন সংহতির বিষয়টিই প্রধান্য পায়। এর ফলে একই দেশের ভেতর দুটি ভিন্ন দিনে ধর্মীয় উৎসব পালিত হলেও স্থানীয় পর্যায়ে তা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্যের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে।

সব মিলিয়ে, মঙ্গলবার রাত থেকেই চাঁদপুরের এই গ্রামগুলোতে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। সেহরির আলোকসজ্জা আর দোয়ার ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠবে সাদ্রা দরবারসহ সংলগ্ন জনপদ।

Tags: saudi arabia chandpur news lunar calendar ramadan 2024 fasting tradition sadra darbar religious legacy bangladesh ramadan fasting start community spirit