কক্সবাজারের নয়নাভিরাম মেরিন ড্রাইভ (Marine Drive) সড়ক সংলগ্ন টেকনাফ সৈকতে আছড়ে পড়া নীল ঢেউ যেন আজ এক বিষাদমাখা রহস্য বয়ে আনল। বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের উত্তর লম্বরী ও মিটাপানির ছড়া নৌঘাট এলাকায় দুই অজ্ঞাতপরিচয় তরুণ-তরুণীর মরদেহ ভেসে আসার ঘটনায় পুরো জনপদে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটন নগরীর উপকণ্ঠে এই দুই নিথর দেহের প্রাপ্তি নিছক দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো গভীর রহস্যের ইঙ্গিত, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
সৈকতে ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে নিথর দেহের দেখা স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও জেলেরা জানিয়েছেন, বুধবার সকাল ৯টার দিকে সাগরের জোয়ারের পানির সঙ্গে তীরে দুটি মরদেহ ভেসে থাকতে দেখা যায়। উত্তর লম্বরী এবং মিটাপানির ছড়া ঘাটের মাঝামাঝি স্থানে প্রায় কাছাকাছি অবস্থানে থাকা মরদেহ দুটি দেখে দ্রুত টেকনাফ মডেল থানায় খবর দেওয়া হয়। মুহূর্তের মধ্যেই খবরটি ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় উৎসুক জনতা সৈকতে ভিড় জমান। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে মরদেহগুলো কিছুটা বিকৃত হলেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল তারা তরুণ ও তরুণী।
মরদেহের অবস্থা ও ঘনীভূত রহস্যের ইঙ্গিত উদ্ধারকৃত মরদেহ দুটির বর্ণনায় এক রহস্যময় অমিল খুঁজে পেয়েছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া তরুণীর শরীরে কোনো পোশাক ছিল না, যা এই মৃত্যুকে ঘিরে একাধিক প্রশ্ন জন্ম দিচ্ছে। অন্যদিকে, তরুণের পরনে ছিল লম্বা প্যান্ট ও শীতকালীন জ্যাকেট। এই অসামঞ্জস্যতা দেখে স্থানীয়দের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়েছে—এটি কি কোনো গভীর সাগরের ট্রলার দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত কোনো ঘটনা (Foul Play)? পোশাকের এই ভিন্নতা এবং মৃতদেহের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না তদন্তকারীদের মাঝেও।
পুলিশি তৎপরতা ও আইনগত প্রক্রিয়া খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে পৌঁছায় টেকনাফ মডেল থানার একটি বিশেষ দল। উপপরিদর্শক (SI) আব্দুস সালামের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা মরদেহ দুটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসেন। টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (OC) মো. সাইফুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, "খবর পাওয়ামাত্রই আমরা ফোর্স পাঠিয়েছি। বর্তমানে মরদেহ দুটির সুরতহাল (Surathal Report) প্রস্তুত করা হচ্ছে। মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের (Post-mortem) জন্য কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হবে।"
পরিচয় শনাক্তের চ্যালেঞ্জ ও তদন্তের মোড় নিহত তরুণ-তরুণীর পরিচয় এখনো উদ্ঘাটন সম্ভব হয়নি। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ডেটাবেসের মাধ্যমে শনাক্তকরণের (Identification) চেষ্টা চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী কোনো এলাকা থেকে কেউ নিখোঁজ রয়েছে কি না, সে বিষয়েও খোঁজ নিচ্ছে Law Enforcement এজেন্সিগুলো। প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট না হলেও সমুদ্রের নোনা জলে মরদেহের ফোলা ভাব দেখে ধারণা করা হচ্ছে, কয়েক ঘণ্টা আগে তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
সৈকতে এই যুগল লাশের উপস্থিতি টেকনাফের সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে। সমুদ্রপথে অবৈধ যাতায়াত কিংবা ব্যক্তিগত কোনো ট্র্যাজেডির ফলাফল কি না এই মৃত্যু, তা উদঘাটনই এখন জেলা পুলিশের প্রধান লক্ষ্য।