বিশ্বক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি এবং ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার এবারের বিশ্বকাপ মিশন শেষ হলো চরম হতাশায়। জিম্বাবুয়ে ও শ্রীলঙ্কার কাছে টানা হারে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল অজিরা। সবশেষ বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) আয়ারল্যান্ড-জিম্বাবুয়ে ম্যাচটি বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হওয়ায় এক ম্যাচ হাতে থাকতেই বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেল মিচেল মার্শ বাহিনীর। ২০০৯ সালের পর এই প্রথম আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের (T20 World Cup) গ্রুপ পর্ব থেকেই বাড়ির পথ ধরতে হচ্ছে ক্যাঙ্গারুদের। এই নজিরবিহীন ব্যর্থতার নেপথ্যে কী কারণ রয়েছে, তা খুঁজে বের করতে এবার পূর্ণাঙ্গ ‘ফরেনসিক পর্যালোচনা’ (Forensic Review) বা গভীর ব্যবচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া।
স্মিথ-বিতর্ক ও সিলেকশন পলিসি নিয়ে প্রশ্ন
অস্ট্রেলিয়ার এই বিদায়ের পর সবচেয়ে বড় সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে টিম ম্যানেজমেন্টের সিলেকশন পলিসি (Selection Policy)। বিশেষ করে আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটার স্টিভ স্মিথকে নিয়ে খামখেয়ালি আচরণ সমর্থকদের ক্ষুব্ধ করেছে। সিডনি সিক্সার্সের হয়ে বিগ ব্যাশ লিগে (BBL) গত চার মৌসুমে ১৭০-এর বেশি স্ট্রাইক রেটে রান করার পরও শুরুতে তাঁকে স্কোয়াডে রাখা হয়নি। জশ হ্যাজেলউডের ইনজুরিতে শেষ মুহূর্তে দলে ডাক পেলেও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁকে ডাগআউটে বসে থাকতে হয়েছে।
অন্যদিকে, টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে অধিনায়ক মিচেল মার্শের ইনজুরি অজি শিবিরের পরিকল্পনা তছনছ করে দেয়। মার্শ দলে ফেরার কারণে টপ-অর্ডার বিকল্প হিসেবে থাকা স্মিথকে আর একাদশে জায়গা দেওয়া হয়নি। এই সিদ্ধান্তটি কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল, তা নিয়ে এখন চলছে ব্যাপক সমালোচনা।
ব্যর্থতার ব্যবচ্ছেদ: ফরেনসিক পর্যালোচনা
অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড সাধারণত বড় কোনো বিপর্যয়ের পর পারফরম্যান্স অডিট (Performance Audit) বা বিস্তারিত পর্যালোচনার প্রথা মেনে চলে। নির্বাচক টনি ডোডেমেইড জানিয়েছেন, ওমানের বিপক্ষে শেষ ‘ডেড রাবার’ (Dead Rubber) ম্যাচ খেলে দেশে ফেরার পর পুরো টুর্নামেন্টের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করা হবে।
ডোডেমেইড বলেন, “টুর্নামেন্ট যেভাবে শেষ হলো, তা আমাদের জন্য ভীষণ হতাশাজনক। তবে এখনই আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাই না। আমরা একটি বিস্তারিত পর্যালোচনা (Detailed Review) করব যেখানে খেলোয়াড়দের ফর্ম, কৌশলগত ভুল এবং ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তগুলো খতিয়ে দেখা হবে।”
শ্রীলঙ্কা ম্যাচে ব্যাটিং বিপর্যয় ও নিশঙ্কার দাপট
অস্ট্রেলিয়ার বিদায়ঘণ্টা কার্যত বেজে গিয়েছিল পাল্লেকেলেতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচেই। ওপেনিং জুটিতে মিচেল মার্শ ও ট্র্যাভিস হেড মাত্র ৮.৩ ওভারে ১০৪ রান যোগ করার পর মনে হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া বিশাল সংগ্রহ গড়বে। কিন্তু মিডল অর্ডারের ব্যাটিং ধসে সেই সম্ভাবনা ভেস্তে যায়। ১৮২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শ্রীলঙ্কার পাথুম নিশাঙ্কা ৫২ বলে বিধ্বংসী সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে অজিদের ধরাশায়ী করেন।
নির্বাচকরা ক্যামেরন গ্রিন, মার্কাস স্টয়নিস এবং গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের মতো অলরাউন্ডারদের (All-rounders) ওপর ভরসা রাখলেও, শ্রীলঙ্কার স্পিন অ্যাটাকের সামনে তাঁরা কার্যকর হতে পারেননি। বাঁহাতি স্পিনের অপশন বাড়াতে কুহনেমানের বদলে তরুণ কুপার কনোলিকে নেওয়ার ঝুঁকিও কাজে আসেনি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সংস্কারের ইঙ্গিত
আগামী শুক্রবার ওমানের বিপক্ষে ম্যাচটি অস্ট্রেলিয়ার জন্য কেবল আনুষ্ঠানিকতার। এই আসর থেকে বিদায়ের পর অজি ক্রিকেটে বড় ধরনের সংস্কারের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে সিনিয়র খেলোয়াড়দের ভূমিকা এবং টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের জন্য স্পেশালিস্ট ব্যাটার বনাম অলরাউন্ডার তত্ত্বের ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে ভাবছে বোর্ড। এই ‘ফরেনসিক পর্যালোচনা’র রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের রোডম্যাপ (Roadmap) তৈরি করবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া।