বিশ্ব রাজনীতিতে ঘনীভূত হওয়া যুদ্ধের কালো মেঘের সরাসরি প্রভাব পড়ল বিশ্ব অর্থনীতিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম সব রেকর্ড চুরমার করে এক ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত বুধবার লেনদেনের একপর্যায়ে প্রতি আউন্স (২৮.৩৫ গ্রাম) সোনার দাম ৫ হাজার ডলারের মনস্তাত্ত্বিক মাইলফলক অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার বাজার মূল্য (Market Value) দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ১৩ হাজার ২০৫ টাকা। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে দাম বৃদ্ধির হার ২.৫ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় উল্লম্ফন।
যুদ্ধের আশঙ্কায় কাঁপছে বিশ্ববাজার: ট্রাম্পের ‘হামলা’ কি সময়ের অপেক্ষা?
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের (Market Analysts) মতে, মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বাড়তে থাকা চরম ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাই (Geopolitical Tension) এই অস্থিরতার প্রধান কারণ। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে সরাসরি সামরিক হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন খবর চাউর হওয়ার পর থেকেই বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
হোয়াইট হাউসের (White House) এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে একাধিক বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানে মার্কিন বাহিনীর হামলার সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ। এমন যুদ্ধাবস্থায় লগ্নিকারীরা তাঁদের পুঁজি সুরক্ষিত রাখতে স্টক মার্কেট বা মুদ্রার বদলে ‘সেফ হ্যাভেন’ (Safe Haven) হিসেবে পরিচিত সোনার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে চাহিদার চাপে হু হু করে বাড়ছে দাম।
কূটনীতি বনাম যুদ্ধের দামামা: কেন এই অস্থিরতা?
আশ্চর্যের বিষয় হলো, একদিকে যখন ওমান ও সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু প্রকল্প নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, অন্যদিকে তখনই যুদ্ধের দামামা বাজছে। গত সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি দাবি করেছিলেন, দুই দেশ একটি ‘নির্দেশিকা নীতিমালা’ বা পলিসি গাইডলাইনে (Policy Guideline) পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। সেই খবরের রেশ ধরে মঙ্গলবার সোনার দাম সামান্য কমে ৪ হাজার ৯০০ ডলারে নেমেছিল। কিন্তু বুধবার ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের খবর আসতেই বাজার ফের অগ্নিমূল্য হয়ে ওঠে।
২০২৬-এর শুরু থেকেই চড়া মেজাজে বাজার
চলতি ২০২৬ সালের শুরু থেকেই সোনার বাজার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। জানুয়ারির শুরুতে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ৪ হাজার ৩১৩ ডলার। কিন্তু তেহরানকে চাপে রাখতে ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রসীমায় শক্তিশালী নৌবহর পাঠানোর পর থেকেই অস্থিরতা শুরু হয়। জানুয়ারির শেষের দিকে দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৪০৭ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে দাম বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ১৩.২ শতাংশ। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে এসে সেই রেকর্ডও ভেঙে গেল।
সোনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রুপাও
কেবল সোনা নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রুপার দামও। বুধবার প্রতি আউন্স রুপা ৭৭.৭ ডলারে বিক্রি হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ৫.৭ শতাংশ বেশি। বিশ্ব অর্থনীতির এই অস্থির সময়ে মূল্যবান ধাতুগুলোর এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতির (Inflation) আশঙ্কাকে আরও উসকে দিচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সংঘর্ষে রূপ নেয়, তবে বিশ্ববাজারে সোনা ও তেলের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা নিয়ে রীতিমতো শঙ্কিত অর্থনীতিবিদরা। এখন সবার নজর জেনেভায় চলতে থাকা আলোচনার টেবিল এবং ওয়াশিংটনের পরবর্তী সামরিক মুভমেন্টের দিকে।