• আন্তর্জাতিক
  • ‘হাড় না ভাঙা পর্যন্ত স্ত্রীকে মারধর বৈধ!’ আফগানিস্তানে তালেবানের নতুন দণ্ডবিধিতে শিউরে উঠছে বিশ্ব

‘হাড় না ভাঙা পর্যন্ত স্ত্রীকে মারধর বৈধ!’ আফগানিস্তানে তালেবানের নতুন দণ্ডবিধিতে শিউরে উঠছে বিশ্ব

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
‘হাড় না ভাঙা পর্যন্ত স্ত্রীকে মারধর বৈধ!’ আফগানিস্তানে তালেবানের নতুন দণ্ডবিধিতে শিউরে উঠছে বিশ্ব

৯০ পৃষ্ঠার এই নতুন আইনে নারীদের মর্যাদা দাসের পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে; অপরাধীদের সামাজিক অবস্থানভেদে শাস্তির ভিন্নতা রাখারও ঘোষণা।

আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই নারীদের অধিকারের ওপর একের পর এক খড়্গ চালিয়েছে তালেবান সরকার। তবে এবার তারা যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা সভ্য জগতের সমস্ত কল্পনাকে হার মানিয়েছে। স্ত্রী ও সন্তানদের মারধর করার ক্ষেত্রে ‘হাড় না ভাঙা’ পর্যন্ত এক বীভৎস সীমা বেঁধে দিয়ে পারিবারিক সহিংসতাকে (Domestic Violence) কার্যত আইনি বৈধতা দিয়েছে তালেবান। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

৯৩ পৃষ্ঠার এক ‘মধ্যযুগীয়’ দণ্ডবিধি

তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার স্বাক্ষরিত ৯০ পৃষ্ঠার এই নতুন ফৌজদারি আইন বা ‘ক্রিমিনাল কোড’ (Criminal Code) সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। পশতু ভাষায় যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘দে মহাকুমু জাজাই ওসুলনামা’। এই দণ্ডবিধিতে এমন কিছু চর্চাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আধুনিক মানবাধিকার (Human Rights) ধারণার পরিপন্থী। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই আইনের মাধ্যমে আফগান নারীদের সামাজিক অবস্থানকে কার্যত ‘দাসের’ সমপর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, স্বামী বা ‘দাস-মালিকরা’ তাদের অধীনস্তদের সংশোধন করার জন্য নিজেদের ইচ্ছেমতো মারধর বা শারীরিক শাস্তি দিতে পারবেন।

সহিংসতার নয়া ‘মানদণ্ড’: হাড় ভাঙলে তবেই শাস্তি

নতুন এই দণ্ডবিধিতে পারিবারিক সহিংসতার একটি ভয়াবহ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মারধরের ফলে যদি স্ত্রী বা সন্তানের হাড় ভেঙে যায় কিংবা স্থায়ী শারীরিক জখম হয়, তবেই কেবল স্বামী বা অভিভাবককে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। অর্থাৎ, হাড় না ভাঙা পর্যন্ত যে কোনো ধরণের শারীরিক নির্যাতন এখন আফগানিস্তানে ‘আইনত বৈধ’।

মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে নারীর ওপর পুরুষের চরম আধিপত্য স্থাপনের একটি আইনি হাতিয়ার। যদি কোনো নারী আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে প্রমাণ করতেও পারেন যে তিনি গুরুতর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সেক্ষেত্রেও অভিযুক্ত স্বামীর সর্বোচ্চ সাজা হবে মাত্র ১৫ দিনের কারাদণ্ড।

বিচারের নামে প্রহসন: ‘মাহরাম’ ও আবশ্যিক পর্দা

নির্যাতিত নারীদের জন্য ন্যায়বিচারের পথটি কেবল কঠিন নয়, বরং এক প্রকার অসম্ভব করে তোলা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কোনো নারী নির্যাতনের বিচার চাইতে হলে তাঁকে একজন পুরুষ অভিভাবক বা ‘মাহরাম’ (Mahram) সাথে নিয়ে আদালতে আসতে হবে। পরিহাসের বিষয় হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বামীই যেখানে মূল অপরাধী, সেখানে তাঁর বিরুদ্ধেই অভিযোগ জানাতে অন্য কোনো পুরুষ আত্মীয়ের মুখাপেক্ষী হতে হবে নারীকে।

এছাড়া, বিচারকের সামনে জখম দেখানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে চরম কঠোরতা। নারীদের সম্পূর্ণ আবৃত বা পর্দা বজায় রেখেই ক্ষতস্থান প্রদর্শন করতে হবে, যা আইনি প্রমাণের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল ও অমর্যাদাকর করে তুলেছে। কাবুলে কর্মরত এক আইন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এই প্রক্রিয়ার চেয়ে মৃত্যু ভালো—এমন আর্তনাদ এখন আফগান নারীদের মুখে মুখে।

শ্রেণি বৈষম্য ও আলেমদের ‘দায়মুক্তি’

তালেবানের এই নতুন আইন ব্যবস্থায় কেবল লিঙ্গ বৈষম্য নয়, বরং একটি নতুন ‘বর্ণপ্রথা’ বা ক্লাস সিস্টেম (Class System) প্রবর্তন করা হয়েছে। শাস্তির ধরণ নির্ধারিত হবে অপরাধীর সামাজিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে।

শীর্ষবিন্দুতে ধর্মীয় আলেম: আলেমদের কোনো অপরাধের জন্য ফৌজদারি বিচার হবে না, তাঁদের কেবল ‘পরামর্শ’ দেওয়া হবে।

অভিজাত ও মধ্যবিত্ত: তাঁদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি কেবল আদালতে তলব বা কারাদণ্ড।

শ্রমজীবী ও নিম্নবিত্ত: সমাজের নিচুতলার মানুষের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে কারাদণ্ডের পাশাপাশি কঠোর শারীরিক শাস্তি।

বাবার বাড়িতেও নেই নিরাপদ আশ্রয়

তালেবানের নতুন দণ্ডবিধির ৩৪ নম্বর ধারাটি নারীদের জন্য আরও বড় বিপদ ডেকে এনেছে। এই ধারা অনুযায়ী, কোনো নারী যদি স্বামীর অনুমতি ছাড়া বারবার তাঁর বাবার বাড়ি বা আত্মীয়ের বাড়িতে যান, তবে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এমনকি যেসব স্বজনরা নির্যাতনের শিকার নারীকে আশ্রয় দেবেন, তাঁদেরও তিন মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে। এর ফলে নির্যাতিত নারীদের পালানোর বা আশ্রয় নেওয়ার শেষ পথটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘রাওয়াদারি’-র নির্বাহী পরিচালক শাহরজাদ আকবর বলেন, “এই দণ্ডবিধি নারীদের অধিকারের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। এটি অপরাধের বিচারের চেয়ে অপরাধীর সামাজিক মর্যাদা রক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।”

পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সমর্থিত পূর্ববর্তী সরকার যেখানে লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর আইন এবং দীর্ঘ কারাদণ্ডের বিধান রেখেছিল, সেখানে তালেবানের এই নতুন ‘দে মহাকুমু জাজাই ওসুলনামা’ আফগানিস্তানকে কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে নিয়ে গেল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

Tags: human rights domestic violence gender inequality afghanistan news taliban law afghanistan women criminal code sharia law global outcry taliban decree