১০ দিন। হাতে মাত্র ২৪০ ঘণ্টা সময়। এই সময়ের মধ্যেই ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নতুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হবে—নইলে নেমে আসবে ‘ভয়াবহ পরিণতি’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই চরম হুঁশিয়ারির পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন এক টানটান উত্তেজনা। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’ সম্মেলনে ট্রাম্পের এই বিতর্কিত আল্টিমেটাম তেহরানকে কোন পথে ঠেলে দেবে, তা নিয়ে এখন তোলপাড় বিশ্ব কূটনীতি।
ট্রাম্পের ডেডলাইন: ‘চুক্তি করো, নয়তো ফল ভোগ করো’
গত বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) গাজার বোর্ড অব পিসের এক সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরানকে এই সময়সীমা বেঁধে দেন। হোয়াইট হাউসের (White House) এই অবস্থান থেকে পরিষ্কার যে, বাইডেন প্রশাসনের নীতি ঝেড়ে ফেলে ট্রাম্প এখন সরাসরি ‘প্রেশার ট্যাকটিকস’ বা চাপের রাজনীতিতে ফিরেছেন। ট্রাম্পের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, ১০ দিনের মধ্যে যদি ইরান আলোচনায় না আসে এবং মার্কিন শর্তানুযায়ী পরমাণু চুক্তি (Nuclear Deal) বা নতুন কোনো সমঝোতায় না পৌঁছায়, তবে সামরিক পদক্ষেপসহ ‘অপ্রীতিকর’ অনেক কিছুই ঘটতে পারে।
ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি: লক্ষ্যবস্তু হবে মার্কিন ঘাঁটি
ট্রাম্পের এই হুমকিতে বিন্দুমাত্র দমে যাওয়ার লক্ষণ দেখায়নি তেহরান। বরং পাল্টা চরম সামরিক হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা। জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী দূত সরাসরি সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে একটি চিঠি লিখেছেন। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইরান কখনও যুদ্ধ চায় না, কিন্তু সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা পিছপা হবে না।
চিঠিতে ইরান সতর্ক করে বলেছে, যদি ইরানি ভূখণ্ডে কোনোভাবে হামলা চালানো হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত সামরিক ঘাঁটি (Military Bases) এবং অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে একযোগে পাল্টা হামলা চালানো হবে। অর্থাৎ, ওয়াশিংটন যদি ‘সীমিত হামলার’ পথে হাঁটে, তবে ইরান তাকে একটি আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে রূপ দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রাখল।
মার্কিন নীল নকশা: ‘লিমিটেড স্ট্রাইক’ থেকে সরকার পতন
এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল (Wall Street Journal) আজ শুক্রবার এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে পেন্টাগনের সম্ভাব্য যুদ্ধকৌশলের তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র শুরুতে ইরানের ওপর বড় আকারের হামলা না চালিয়ে ‘লিমিটেড স্ট্রাইক’ (Limited Strike) বা সীমিত হামলার পরিকল্পনা করছে। এর প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু হবে ইরানের সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ভবন এবং নিরাপত্তাবাহিনীর প্রধান প্রধান অবকাঠামো (Infrastructure)।
এই হামলার মূল উদ্দেশ্য হবে তেহরানকে একটি কঠিন পরমাণু চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা। তবে এতেও যদি ইরান নতি স্বীকার না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় ধাপের পরিকল্পনা বা ‘প্ল্যান বি’ (Plan B) কার্যকর করবে। সেই ধাপে সরাসরি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সরকারের পতন (Regime Change) ঘটানোর লক্ষ্যে ব্যাপক আকারের সামরিক অভিযান শুরু করা হতে পারে।
অনিশ্চয়তায় মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা
ট্রাম্পের এই আল্টিমেটামের ফলে জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক শেয়ার বাজারেও অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক শক্তিগুলো এখন গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে, ১০ দিনের এই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ড্রোন আর মিসাইলের গর্জন শুরু হয়, নাকি শেষ মুহূর্তে কূটনীতির কোনো পথ উন্মোচিত হয়।
মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা পেন্টাগন (Pentagon) এবং ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC)—দুই পক্ষই এখন উচ্চ সতর্কাবস্থায় (High Alert) রয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ১০ দিন হতে চলেছে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ।