ইউরোপের মাটিতে আশ্রয়ের স্বপ্ন ভঙ্গ হওয়া অভিবাসীদের জন্য এবার এক কঠোর ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-ভুক্ত প্রভাবশালী পাঁচ দেশ। আশ্রয় আবেদন বাতিল হওয়া অভিবাসীদের সরাসরি নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বদলে ইইউর সীমানার বাইরে কোনো তৃতীয় দেশে ‘রিটার্ন হাব’ (Return Hub) বা বিশেষ প্রত্যাবাসন কেন্দ্র নির্মাণের চূড়ান্ত পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। গ্রিসের নেতৃত্বে এই মহাপ্রকল্পে সামিল হয়েছে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া এবং ডেনমার্ক।
তাত্ত্বিক আলোচনা পেরিয়ে এবার বাস্তব রূপরেখা
গ্রিসের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইআরটি টেলিভিশন’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে দেশটির অভিবাসনমন্ত্রী থানোস প্লেভরিস এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বিষয়টি এখন আর কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই। এই পাঁচ দেশের মন্ত্রীরা ইতোমধ্যে একাধিকবার বৈঠকে বসেছেন এবং আগামী সপ্তাহেই একটি উচ্চপর্যায়ের টেকনিক্যাল টিম (Technical Team) বিস্তারিত রূপরেখা তৈরিতে কাজ শুরু করবে। প্লেভরিসের ভাষায়, "আমরা এখন কেবল তাত্ত্বিক তর্কে নেই, বরং একটি বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর সমাধান বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছি।"
কেন বেছে নেওয়া হচ্ছে আফ্রিকাকে?
প্রাথমিক আলোচনায় এই রিটার্ন হাব বা প্রত্যাবাসন কেন্দ্রটি আফ্রিকার কোনো একটি দেশে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। যদিও মহাদেশটির নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তবে ইউরোপের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো ইতোমধ্যে আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করেছে। এই কেন্দ্রের মূল কাজ হবে সেইসব ব্যক্তিদের সাময়িকভাবে রাখা, যাদের আশ্রয় আবেদন (Asylum Application) বাতিল করা হয়েছে এবং যাদেরকে তাদের নিজ দেশ তাৎক্ষণিকভাবে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমানার বাইরে এমন কেন্দ্র স্থাপন করা হলে তা অনিয়মিত অভিবাসীদের (Irregular Migrants) মধ্যে একটি শক্তিশালী নেতিবাচক বার্তা পাঠাবে বলে মনে করছে এই জোট।
অনিয়মিত অভিবাসন রুখতে কঠোর গ্রিস
ইউরোপে ঢোকার অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত গ্রিস গত এক দশকে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসা বিপুল সংখ্যক মানুষের চাপ সামলাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গ্রিসের কঠোর অবস্থানের কারণে ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে অনিয়মিত অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ২১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এমনকি গত পাঁচ মাসে এই হার অন্তত ৪০ শতাংশ কমেছে।
থানোস প্লেভরিস আরও জানান, প্রতি বছর গ্রিসে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার নতুন অভিবাসী আসেন, যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষের আশ্রয় আবেদন শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যায়। অথচ গ্রিস বছরে মাত্র ৫ থেকে ৭ হাজার মানুষকে সফলভাবে প্রত্যাবাসন (Repatriation) করতে পারে। এই বিশাল ব্যবধান কমাতেই ‘রিটার্ন হাব’ নির্মাণের উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে গ্রিক সরকার।
নতুন ইইউ অভিবাসন নীতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
গত সপ্তাহে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অনুমোদিত নতুন অভিবাসন নীতি এই ধরণের ‘রিটার্ন হাব’ নির্মাণের পথ আরও প্রশস্ত করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অভিবাসী যদি ইইউর বাইরে কোনো ‘নিরাপদ’ দেশ থেকে আসেন কিংবা অন্য কোথাও আশ্রয়ের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে ইইউ তাঁকে সরাসরি ফেরত পাঠাতে পারবে।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে গ্রিস এখন কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়িয়েছে। আগামী সপ্তাহে রোমে ইতালি ও স্পেনের অভিবাসনমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন থানোস প্লেভরিস। এছাড়া অভিবাসীদের উৎসদেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গেও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ‘পুশব্যাক’ (Pushback) বা তৃতীয় দেশে কেন্দ্র নির্মাণের সমালোচনা করলেও, নিরাপত্তার স্বার্থে এবং ইউরোপের ওপর থেকে অভিবাসনের বাড়তি চাপ কমাতে এই পাঁচ দেশ এখন নিজেদের অবস্থানে অনড়। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এই বিশেষ প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।