• জীবনযাপন
  • আধ্যাত্মিকতার আবহে শারীরিক ও মানসিক পুনর্গঠন: বিজ্ঞানের আয়নায় রোজার বহুমুখী প্রভাব

আধ্যাত্মিকতার আবহে শারীরিক ও মানসিক পুনর্গঠন: বিজ্ঞানের আয়নায় রোজার বহুমুখী প্রভাব

জীবনযাপন ১ মিনিট পড়া
আধ্যাত্মিকতার আবহে শারীরিক ও মানসিক পুনর্গঠন: বিজ্ঞানের আয়নায় রোজার বহুমুখী প্রভাব

কেবল ধর্মীয় অনুশাসন নয়, শরীরকে ‘ডিটক্স’ করতে এবং মানসিক প্রশান্তি অর্জনে রোজা এক অনন্য দাওয়াই; জেনে নিন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি।

ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল স্তম্ভের মধ্যে রোজা বা সিয়াম সাধনা অন্যতম। প্রতি বছর পবিত্র রমজান মাসে বিশ্বজুড়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মহান সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি লাভের আশায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকেন। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, রোজা কেবল একটি আধ্যাত্মিক চর্চাই নয়, বরং এটি শরীর ও মনকে সুস্থ রাখার এক যুগান্তকারী পদ্ধতি। বর্তমান বিশ্বে 'ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং' (Intermittent Fasting) নিয়ে যে ব্যাপক চর্চা চলছে, তার এক পূর্ণাঙ্গ ও বৈজ্ঞানিক রূপই হলো রমজানের রোজা।

দেহঘড়ির আমূল পরিবর্তন ও ‘ডিটক্সিফিকেশন’

রোজার সবচেয়ে বড় শারীরিক উপকারিতা হলো শরীরের অভ্যন্তরীণ বিষক্রিয়া দূর করা বা 'Detoxification'। দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকার ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়া বা 'Metabolism' প্রক্রিয়ায় বিশেষ পরিবর্তন আসে। এতে আমাদের দেহের লিভার এবং কিডনি জমানো টক্সিন বা ক্ষতিকারক বর্জ্য নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত সময় পায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোজার মাধ্যমে শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি গলতে শুরু করে, যা সরাসরি ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। যারা স্থূলতা বা 'Obesity' সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য রমজান মাস একটি আদর্শ সুযোগ। তবে এক্ষেত্রে ইফতার ও সেহরিতে উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের বদলে পুষ্টিকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ডায়েট নিশ্চিত করা জরুরি।

হৃদরোগ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কার্যকর দাওয়াই

গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত রোজা পালনের ফলে রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা কমে এবং ভালো কোলেস্টেরলের (HDL) ভারসাম্য বজায় থাকে। এটি উচ্চ রক্তচাপ বা ‘High Blood Pressure’ নিয়ন্ত্রণে রেখে হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। এছাড়া, রোজা ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়াতে সাহায্য করে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

পাকস্থলী দীর্ঘ সময় খালি থাকায় পাচক রস বা এসিডের নিঃসরণ ধীরগতিতে হয়, যা গ্যাস্ট্রিক বা বদহজমের সমস্যা দূর করে এবং পরিপাকতন্ত্রকে নতুন করে কর্মক্ষম করে তোলে। এটি মূলত শরীরের 'Self-Repair' বা কোষীয় মেরামতের একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।

মানসিক প্রশান্তি ও মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি

রোজার প্রভাব কেবল শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্যও সমানভাবে উপকারী। রোজা রাখার ফলে শরীরে ‘Stress Hormones’ বা কর্টিসলের নিঃসরণ কমে যায়, যা মানসিক চাপ ও উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এটি মস্তিষ্কে নতুন নিউরন তৈরি করতে এবং ‘Brain Function’ বা স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সহায়ক প্রোটিন নিঃসরণ করে।

দীর্ঘ এক মাস আত্মসংযমের মাধ্যমে মানুষ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা ‘Self-Discipline’ ফিরে পায়। ধূমপান বা অতিরিক্ত খাদ্যাভ্যাসের মতো ক্ষতিকর নেশা থেকে মুক্তি পেতে রোজা এক কার্যকরী অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। আধ্যাত্মিক এই অনুশীলনের ফলে মানুষের চিন্তা-চেতনা ও বিচারবুদ্ধি আরও শাণিত হয়, যা সামগ্রিকভাবে মানসিক সুস্থতা (Mental Wellbeing) নিশ্চিত করে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃতি ও বিশেষজ্ঞ মতামত

রোজার গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. আইজাক জেনিংস বলেছিলেন, "যারা অলসতা ও অতিভোজনের মাধ্যমে নিজেদের জীবনীশক্তিকে ভারাক্রান্ত করে আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যায়, রোজা তাদের এই মহাবিপদ থেকে রক্ষা করে।" আধুনিক বিজ্ঞানও এই মতের সমর্থনে বলছে যে, উপবাসের ফলে কোষের পুনরুজ্জীবন ঘটে এবং বার্ধক্য প্রক্রিয়া ধীর হয়।

কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাগুলোও আজ এক সুরে মিলছে। শারীরিক স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি এবং মানসিক অস্থিরতা ও খিঁচুনি রোধে রোজার কোনো বিকল্প নেই। তাই আত্মিক উন্নতির পাশাপাশি একটি সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের জন্য রমজান মাসের এই শিক্ষা ও অনুশীলন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

Tags: weight loss health benefits mental health diabetes control heart health metabolism boost detoxification brain power ramadan fasting stress reduction