পবিত্র রমজান মাসে দীর্ঘ সময় উপবাসের ফলে শরীরে শক্তির ঘাটতি, পানিশূন্যতা এবং ক্লান্তি আসা স্বাভাবিক। এই সময় ইফতার ও সেহরিতে সঠিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানে ‘সুপারফুড’ (Superfood) হিসেবে স্বীকৃত বিটরুট বা বিট হতে পারে আপনার রমজানের ডায়েটের অন্যতম সেরা সংযোজন। উজ্জ্বল লাল রঙের এই সবজিটি কেবল খাবারের স্বাদ বাড়ায় না, বরং রোজাদারদের শারীরিক জটিলতা কমাতেও ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
নিচে রমজানে বিটরুটের ছয়টি বিশেষ উপকারিতা এবং এটি ব্যবহারের সঠিক নিয়ম তুলে ধরা হলো:
১. দ্রুত এনার্জি বুস্টার হিসেবে কাজ করে দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর শরীরের ‘Metabolism’ বা বিপাকক্রিয়া কিছুটা ধীর হয়ে যায়। বিটরুটে রয়েছে প্রাকৃতিক চিনি ও কার্বোহাইড্রেট, যা ইফতারের পরপরই রক্তে শর্করার মাত্রা ভারসাম্যপূর্ণ করে দ্রুত শক্তি জোগাতে সাহায্য করে। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে এক গ্লাস বিটরুটের শরবত অত্যন্ত কার্যকর।
২. রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া প্রতিরোধ যাঁরা রক্তস্বল্পতা বা ‘Anemia’-তে ভুগছেন, তাঁদের জন্য বিটরুট একটি আশীর্বাদ। এতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন এবং ফলেট রয়েছে, যা রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়িয়ে শরীরের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া উন্নত করে। নিয়মিত বিটরুট সেবনে রোজার ক্লান্তিভাব অনেকটাই কমে যায়।
৩. ব্লাড প্রেশার বা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ বিটরুটে উচ্চমাত্রায় ‘Nitrate’ থাকে। এই নাইট্রেট শরীরে গিয়ে নাইট্রিক অক্সাইডে রূপান্তরিত হয়, যা রক্তনালীগুলোকে প্রসারিত করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য ইফতারে বিটরুটের সালাদ একটি স্বাস্থ্যকর ‘Dietary Supplement’ হতে পারে।
৪. হজম প্রক্রিয়া ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা রমজানে ভাজাপোড়া খাওয়ার ফলে অনেকেরই কোষ্ঠকাঠিন্য বা বদহজমের সমস্যা দেখা দেয়। বিটরুটে থাকা প্রচুর পরিমাণে ‘Dietary Fiber’ বা আঁশ হজম প্রক্রিয়াকে সচল রাখে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। এটি পেটের অস্বস্তি দূর করতে দারুণ কার্যকর।
৫. হাইড্রেশন বজায় রাখা বিটরুটে প্রায় ৮৭ শতাংশ পানি থাকে। ইফতারের পর শরীরকে পুনরায় আর্দ্র বা ‘Hydrated’ করতে বিটরুট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিটরুটের জুস বা সালাদ শরীরকে পানিশূন্যতা (Dehydration) থেকে রক্ষা করে এবং সতেজ রাখে।
৬. লিভার ডিটক্সিফিকেশন (Detoxification) রমজানে আমরা অনেক সময় অতিরিক্ত তেল ও মশলাযুক্ত খাবার খেয়ে ফেলি, যা লিভারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। বিটরুটে থাকা শক্তিশালী ‘Antioxidants’ লিভার থেকে টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে এবং এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। এটি শরীরকে ভেতর থেকে পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করে।
কীভাবে খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করবেন?
রিফ্রেশিং জুস: ইফতারে অতিরিক্ত চিনি ছাড়া বিটরুট ও আপেলের হালকা জুস তৈরি করে পান করতে পারেন।
কালারফুল সালাদ: শসা, গাজর ও লেবুর রসের সঙ্গে গ্রেট করা বিটরুট মিশিয়ে সালাদ হিসেবে খাওয়া সবচেয়ে ভালো।
হালকা সিদ্ধ: সেহরিতে ভাতের সঙ্গে অল্প পরিমাণে সিদ্ধ বিটরুট যোগ করতে পারেন, যা হজমে সুবিধা দেবে।
সতর্কতা ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ পুষ্টিগুণে ভরপুর হলেও বিটরুট খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। যাঁদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁরা বিটরুটের প্রাকৃতিক চিনির কথা মাথায় রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করবেন। এছাড়া, বিটরুটে ‘Oxalate’ থাকে, তাই যাঁদের কিডনিতে পাথরের (Kidney Stones) সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এটি এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
রমজানের এই এক মাস সুস্থ থেকে সিয়াম সাধনার জন্য বিটরুট হতে পারে আপনার প্রতিদিনের খাবারের তালিকার এক অপরিহার্য অংশ।