পবিত্র রমজান মাসে দীর্ঘ সময় উপবাসের পর আমাদের শরীরের ‘Metabolism’ বা বিপাকক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। দীর্ঘক্ষণ পাকস্থলী খালি থাকার পর হঠাৎ করে ইফতারে অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত বা ভারী খাবার খেলে বদহজম, গ্যাস কিংবা বুকজ্বালার মতো সমস্যা দেখা দেওয়া খুবই স্বাভাবিক। রোজা কেবল ধর্মীয় বিধানই নয়, এটি শরীরের জন্য একটি চমৎকার ‘Detoxification’ প্রক্রিয়াও বটে। তবে এই সুফল পেতে হলে ইফতার ও সেহরিতে খাবার নির্বাচনে হতে হবে অত্যন্ত সচেতন।
সুস্থ থেকে পুরো মাস রোজা পালন করতে চাইলে আপনার খাদ্যতালিকায় যে পরিবর্তনগুলো আনা জরুরি, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ইফতারের শুরু হোক বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে
সারাদিন পানিশূন্য থাকার পর ইফতারের শুরুতেই পাকস্থলীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা ঠিক নয়। শরীরকে রি-হাইড্রেট করতে এবং হজম প্রক্রিয়া সচল করতে নিচের খাবারগুলো বেছে নিন:
খেজুরের জাদুকরী গুণ: রোজা ভাঙার জন্য ১-২টি খেজুর সবচেয়ে আদর্শ। এতে থাকা প্রাকৃতিক শর্করা দ্রুত শক্তি জোগায় এবং এর উচ্চমাত্রার ‘Fiber’ বা আঁশ হজমে দারুণ সহায়তা করে। বিশেষ করে মেদজুল বা আজওয়া খেজুর পুষ্টিগুণে অনন্য।
হালকা ঘরোয়া স্যুপ: ডাল, সবজি বা চিকেন স্যুপ পাকস্থলীকে পরবর্তী খাবারের জন্য প্রস্তুত করে। এটি তরল হওয়ায় খুব সহজেই হজম হয় এবং শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখে।
প্রোবায়োটিকের উৎস টকদই: ইফতারে এক বাটি টকদই আপনার ‘Gut Health’ বা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। দইয়ে থাকা ‘Probiotics’ বা ভালো ব্যাকটেরিয়া দ্রুত হজমে সাহায্য করে এবং গ্যাসের সমস্যা কমিয়ে দেয়।
সহজপাচ্য ফলমূল: ইফতারের প্লেটে পেঁপে, কলা, আপেল বা তরমুজ রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। বিশেষ করে পেঁপেতে থাকা প্রাকৃতিক ‘Enzymes’ প্রোটিন হজমে বিশেষ ভূমিকা রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
সেহরিতে ফাইবার ও প্রোটিনের ব্যালেন্স
সেহরির খাবার এমন হওয়া উচিত যা আপনাকে সারাদিন কর্মক্ষম রাখবে এবং তৃষ্ণা কমাবে।
কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট: ওটস বা লাল আটার রুটির মতো ‘Complex Carbohydrates’ জাতীয় খাবার ধীরগতিতে শক্তি নির্গত করে। ফলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে এবং হুট করে ক্ষুধা লাগে না।
মানসম্মত প্রোটিন: সেহরিতে ডিম (সিদ্ধ) প্রোটিনের একটি চমৎকার উৎস। তবে অতিরিক্ত তেলে ডিম ভাজা বা অমলেট এড়িয়ে চলাই ভালো।
জলীয় সবজি: লাউ, ঝিঙা বা পালং শাকের মতো হালকা ও জলীয় সবজি হজমে সহায়ক এবং শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।
সঠিক হাইড্রেশন (Hydration): ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত একবারে অনেকটা পানি পান না করে অল্প অল্প করে বিরতি দিয়ে পর্যাপ্ত পানি পান করুন। শরীরে ‘Hydration’ বজায় থাকলে বদহজমের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
সাবধানতা: যা বর্জন করা জরুরি
রমজানে সুস্থ থাকতে হলে কিছু খাদ্যাভ্যাস কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে:
১. অতিরিক্ত ভাজাপোড়া: ইফতার মানেই পিয়াজু, বেগুনি বা সমুচা—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ডুবো তেলে ভাজা খাবার বুকজ্বালা ও এসিডিটির প্রধান কারণ। ২. মশলাদার খাবার: অতিরিক্ত ঝাল ও মশলা পাকস্থলীতে অস্বস্তি তৈরি করে। ৩. কোমল পানীয়: ইফতারে ‘Carbonated Drinks’ বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় তৃষ্ণা মেটানোর বদলে শরীরকে আরও পানিশূন্য করে দেয়। ৪. অতিরিক্ত আহার (Binge Eating): ক্ষুধা মেটাতে গিয়ে ইফতারে একসঙ্গে অনেক বেশি খেয়ে ফেলা বদহজমের মূল কারণ। খাবারের মাঝে ছোট বিরতি নিন।
রমজানের পবিত্রতা ও সুস্বাস্থ্যের জন্য পরিমিতিবোধই হলো আসল কথা। সঠিক খাবার নির্বাচন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা আপনাকে এক প্রশান্তিময় রমজান উপহার দিতে পারে।