পবিত্র রমজান মাসে দীর্ঘ প্রায় ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা অভুক্ত থাকার ফলে আমাদের শরীরের শক্তি ও পুষ্টির স্তরে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। দীর্ঘক্ষণ খাবার ও পানি গ্রহণ না করায় শরীরে ক্লান্তি আসা স্বাভাবিক, তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস বিশেষ করে 'সুষম প্রোটিন' (Balanced Protein) গ্রহণ করলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, সেহরি ও ইফতারে পর্যাপ্ত প্রোটিন জাতীয় খাবার রাখলে তা কেবল পেশি গঠনই নয়, বরং শরীরের মেটাবলিজম (Metabolism) ঠিক রাখতে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে জাদুর মতো কাজ করে।
সুস্থ ও সতেজ থেকে পূর্ণ মাস রোজা পালন করতে ডায়েট চার্টে যে খাবারগুলো রাখা জরুরি, তার একটি বিস্তারিত গাইডলাইন নিচে দেওয়া হলো:
১. ডিম: প্রোটিনের পাওয়ারহাউস ডিমকে বলা হয় 'কমপ্লিট প্রোটিন' (Complete Protein), কারণ এতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় সব কটি এসেনশিয়াল অ্যামিনো অ্যাসিড বিদ্যমান। সেহরিতে একটি বা দুটি সেদ্ধ ডিম কিংবা অল্প তেলে ওমলেট করে খেলে এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং সারাদিন ক্ষুধা অনুভব হতে দেয় না। এটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য পুষ্টির উৎস।
২. চিকেন বা মুরগির মাংস: চর্বিহীন শক্তির উৎস মুরগির বুকের মাংস বা 'লিন মিট' (Lean Meat) উচ্চমানের প্রোটিন সমৃদ্ধ। এটি চর্বিহীন হওয়ায় হজম করা সহজ। ইফতারে অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত চপ বা বেগুনি না খেয়ে গ্রিলড চিকেন বা হালকা স্ট্যু (Stew) করে খেলে তা শরীরের টিস্যু মেরামতে সহায়তা করে এবং এনার্জি (Energy) জোগায়।
৩. রেড মিট বা গরুর মাংস: আয়রনের ভাণ্ডার গরুর মাংস প্রোটিনের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে আয়রন ও জিঙ্ক সরবরাহ করে, যা রক্তস্বল্পতা দূর করতে কার্যকর। তবে রোজার মাসে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত রেড মিট হার্টের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই পরিমিত পরিমাণে এবং কম ঝাল-মশলায় রান্না করা মাংস পাতে রাখা যেতে পারে।
৪. মাছ: ওমেগা-৩ ও সুস্থ হার্ট দেশি মাছ কিংবা সামুদ্রিক মাছ প্রোটিনের পাশাপাশি ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের (Omega-3 Fatty Acids) চমৎকার উৎস। এটি রমজানে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়াতে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। ইফতারে ভাজা মাছের চেয়ে ভাপে রাখা বা ঝোল করা মাছ বেশি স্বাস্থ্যকর।
৫. দুগ্ধজাত খাবার ও ক্যালসিয়াম দুধ, টকদই বা পনির কেবল প্রোটিন নয়, বরং ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি সরবরাহ করে। ইফতারের পর এক বাটি টকদই খেলে সেটি প্রোবায়োটিক (Probiotic) হিসেবে কাজ করে হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে। সেহরিতে এক গ্লাস দুধ পান করা শরীরের পানিশূন্যতা রোধেও সহায়ক।
৬. উদ্ভিজ্জ প্রোটিন: ডাল ও ছোলা যাঁরা প্রাণীজ প্রোটিন এড়িয়ে চলতে চান, তাঁদের জন্য ডাল, ছোলা ও মটরশুঁটি সেরা বিকল্প। ছোলার সালাদ বা ডালের স্যুপ ইফতারে অত্যন্ত পুষ্টিকর। এতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার (Fiber) থাকে, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।
৭. বাদাম ও সুপারফুড বীজ কাঠবাদাম, কাজুবাদাম এবং চিয়া সিড (Chia Seed) অল্প পরিমাণে খেলেই প্রচুর ক্যালরি ও প্রোটিন পাওয়া যায়। চিয়া সিড পানিতে ভিজিয়ে শরবত করে খেলে তা দীর্ঘক্ষণ শরীরকে হাইড্রেটেড (Hydrated) রাখতে এবং তাৎক্ষণিক শক্তি জোগাতে অনন্য।
পুষ্টিবিদদের বিশেষ পরামর্শ (Dietary Strategy): ১. সেহরির কৌশল: সেহরিতে প্রোটিনের সঙ্গে অবশ্যই কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট (যেমন: লাল চাল বা ওটস) রাখুন। এটি শরীরের গ্লাইকোজেন স্টোর বজায় রাখবে। ২. ইফতারের নিয়ম: ইফতারে হঠাৎ করে ভারী খাবার না খেয়ে প্রথমে খেজুর ও জলীয় প্রোটিন (যেমন: শরবত বা স্যুপ) দিয়ে শুরু করুন। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও চিনিযুক্ত পানীয় পরিহার করুন। ৩. হাইড্রেশন: ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত বিরতিতে পর্যাপ্ত পানি পান নিশ্চিত করুন, যাতে প্রোটিন হজমে কোনো সমস্যা না হয়।
সঠিক খাদ্যাভ্যাসই পারে আপনাকে রমজানের পবিত্রতা ও ইবাদতে পূর্ণ মনোনিবেশ করার শারীরিক সক্ষমতা দিতে। সুস্থ থাকুন, পুষ্টিকর খাবার খান।