রাজধানীর মোহাম্মদপুরে দীর্ঘদিনের জনআতঙ্ক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এবার এক অভিনব ও কঠোর অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। বসিলা সিটি হাউজিং ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ব্যবসায়ীদের যমদূত হিসেবে পরিচিত চিহ্নিত সন্ত্রাসী ফারুক ওরফে ‘কালা ফারুক’কে গ্রেপ্তারের পর তাকে নিয়ে খোদ এলাকাতেই মাইকিং করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে যেমন স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে, তেমনি অপরাধীদের জন্য এক কড়া হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ধলেশ্বরীর তীর থেকে যেভাবে ধরা পড়ল ফারুক
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (DMP) তেজগাঁও বিভাগের একটি বিশেষ দল কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালায়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ধলেশ্বরী নদীর তীর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এই দুর্ধর্ষ চাঁদাবাজকে। মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (AC) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, ফারুক ও তার সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে বসিলা গার্ডেন সিটিসহ আশেপাশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছিল। সম্প্রতি এক ব্যবসায়ীর অভিযোগ এবং ফারুকের হুমকি দেওয়ার একাধিক ‘সিসিটিভি ফুটেজ’ (CCTV Footage) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল (Viral) হলে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন।
‘কাউকে চাঁদা দেবেন না’: এলাকায় ওসির রণহুংকার
গ্রেপ্তারের পর ফারুককে সরাসরি নিয়ে আসা হয় তার অপরাধের সাম্রাজ্য বসিলা এলাকায়। সেখানে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (OC) মো. মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ নিজেই হ্যান্ডমাইক হাতে নিয়ে রাস্তায় নামেন। গ্রেপ্তারকৃত চাঁদাবাজকে সাধারণ মানুষের সামনে দেখিয়ে তিনি ঘোষণা করেন, “আপনারা কেউ এই সন্ত্রাসীদের চাঁদা দেবেন না। এই দেখেন আপনাদের ভয় দেখানো চাঁদাবাজকে আমরা ধরেছি। যেখানেই চাঁদাবাজ দেখবেন, আমাদের খবর দেবেন। আমরা তাদের কোনো ছাড় দেব না।”
পুলিশের এমন ‘পাবলিক হিউমিলিয়েশন’ বা জনসমক্ষে অপরাধীকে তুলে ধরার কৌশলটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাহসের সঞ্চার করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, যারা ফারুকের ভয়ে মুখ খুলতে পারতেন না, তারা এখন পুলিশের ওপর আস্থা পাচ্ছেন।
প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে সফল অভিযান
এই অভিযানে পুলিশের পেশাদারিত্ব ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল লক্ষণীয়। মূলত সিসিটিভি (CCTV) বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল সারভাইলেন্স (Digital Surveillance) ব্যবহার করে ফারুকের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এসি আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “ফারুক একজন চিহ্নিত ‘Extortionist’। তাকে গ্রেপ্তারের পর আমরা স্থানীয় সন্ত্রাসী ও দখলবাজদের এই বার্তা দিতে চেয়েছি যে, অপরাধ করলে পালানোর কোনো পথ নেই। মোহাম্মদপুরকে অপরাধমুক্ত করতে আমাদের ‘জিরো টলারেন্স’ (Zero Tolerance) নীতি অব্যাহত থাকবে।”
মোহাম্মদপুরে স্বস্তির হাওয়া
বিগত কয়েক মাসে মোহাম্মদপুর ও বসিলা এলাকায় ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ফারুকের মতো সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। পুলিশের এই হার্ডলাইন (Hardline) অবস্থান অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। এই ঘটনায় ফারুকের অন্যান্য সহযোগীদের ধরতে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে থানা কর্তৃপক্ষ।
ব্যতিক্রমী এই প্রচারণার ভিডিও ও স্থিরচিত্র এখন ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে। নেটিজেনরা পুলিশের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলছেন, অপরাধীদের মনে ভয় ধরাতে এমন ‘প্রকাশ্য অ্যাকশন’ অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল।