বাঙালির আড্ডা হোক কিংবা ক্লান্তি দূর করা—এক কাপ গরম চায়ের বিকল্প মেলা ভার। পবিত্র রমজান মাসে সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারের টেবিলে ভাজাপোড়া আর শরবতের পাট চুকিয়েই অনেকে চায়ের কাপে চুমুক দিতে পছন্দ করেন। কারো জন্য এটি অভ্যাসের অংশ, আবার কারো জন্য মাথা ধরা বা ক্লান্তি দূর করার মহৌষধ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খালি পেটে দীর্ঘ সময় থাকার পর ইফতারের ঠিক পরপরই চা পান করা স্বাস্থ্যের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে।
ইফতার পরবর্তী চা পানের উপকারিতা: স্নায়ুর আরাম ও হজম পরিমিত পরিমাণে এবং সঠিক সময়ে চা পান করলে শরীর ও মনে কিছু ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। চায়ের মধ্যে থাকা 'Antioxidant' এবং 'Caffeine' মানসিক সতেজতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে, যা দীর্ঘদিনের ক্লান্তি দূর করতে কার্যকর। বিশেষ করে চায়ে যদি আদা বা পুদিনা পাতা যোগ করা হয়, তবে তা শরীরের 'Metabolism' বা পরিপাকতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে হজম প্রক্রিয়াকে সহজতর করতে পারে। এছাড়া লিকার চা বা 'Herbal Tea' শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সহায়তা করে।
দ্রুত চা পানের নেপথ্যে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকি ইফতারের পরপরই চা পানের অভ্যাস সাময়িক প্রশান্তি দিলেও এর কিছু দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক দিক রয়েছে যা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়:
১. আয়রন শোষণে বাধা: চায়ের অন্যতম উপাদান হলো ‘ট্যানিন’ (Tannin)। এটি খাবার থেকে প্রাপ্ত আয়রন বা লৌহ শোষণে বাধা সৃষ্টি করে। ইফতারের পুষ্টিকর খাবার থেকে শরীর যে আয়রন গ্রহণ করে, চা পান করলে তার কার্যকারিতা কমে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
২. অ্যাসিডিটি ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা: ইফতারে সাধারণত আমরা বিভিন্ন ধরণের তৈলাক্ত বা মসলাযুক্ত খাবার খেয়ে থাকি। এরপরই যদি চা, বিশেষ করে ‘দুধ চা’ (Milk Tea) পান করা হয়, তবে পাকস্থলীতে অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে বুক জ্বালাপোড়া, বদহজম এবং পেট ফাঁপার মতো অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
৩. ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা: চা একটি প্রাকৃতিক ‘ডাইইউরেটিক’ (Diuretic) পানীয়। এর মধ্যে থাকা ক্যাফেইন প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, ফলে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যায়। সারাদিন পানি না খাওয়ার পর ইফতারের পরপরই চা খেলে শরীরে 'Dehydration' বা পানিশূন্যতার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
কখন চা পানের আদর্শ সময়? স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইফতার শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই চায়ের কাপে হাত দেওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। খাবারের গুণাগুণ শরীর যাতে সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে, সেজন্য ইফতারের অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পর চা পান করা ভালো। এই সময়ের ব্যবধান পাকস্থলীকে খাবার হজম করার প্রয়োজনীয় সুযোগ দেয়।
কী ধরণের চা বাছাই করবেন? ১. লাল চা বা ভেষজ চা: রোজার সময় দুধ চায়ের চেয়ে লেবু-আদা চা, গ্রিন টি (Green Tea) বা ভেষজ চা অনেক বেশি উপকারী। ২. কড়া লিকার এড়িয়ে চলুন: অতিরিক্ত কড়া লিকার বা ‘স্ট্রং ব্ল্যাক টি’ ক্যাফেইনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ৩. চিনির ব্যবহার: চায়ের সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি মেশানো এড়িয়ে চলুন, কারণ এটি রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।
পরিশেষে, রমজানে সুস্থ থাকতে শরীরকে পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার পাশাপাশি অভ্যাসের পরিবর্তনের দিকেও নজর দিতে হবে। ইফতারের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বা মাগরিবের নামাজ শেষ করে আয়েশ করে চা পান করাই হতে পারে স্বাস্থ্যের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত।