• জীবনযাপন
  • হুইলচেয়ারে বসে বাছেদের ফ্রিল্যান্সিং, আয় লাখ টাকার ওপরে

হুইলচেয়ারে বসে বাছেদের ফ্রিল্যান্সিং, আয় লাখ টাকার ওপরে

জীবনযাপন ১ মিনিট পড়া
হুইলচেয়ারে বসে বাছেদের ফ্রিল্যান্সিং, আয় লাখ টাকার ওপরে

২০১৭ সাল। বিকেলের মায়াময় আলোয় একটি মোটরসাইকেলের পেছনে বসে যাচ্ছিলেন এক তরুণ। মুহূর্তের এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসা সেই দিনটি আবদুল বাছেদের জীবনের চিরচেনা ছন্দটা ওলটপালট করে দিয়েছিল। স্পাইনাল কর্ডে আঘাতের কারণে অবশ হয়ে গেল দুই পা। যে চঞ্চল পায়ে তিনি পৃথিবী ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখতেন, সেই পায়েই স্থায়ী সঙ্গী হয়ে গেল একটি হুইলচেয়ার।

প্রচলিত কথায় আছে, ‘একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না।’ কিন্তু বাছেদ সেই কান্না মুছে ফেলে ধৈর্য আর কঠোর পরিশ্রমের এক নতুন অভিধান লিখতে শুরু করলেন। আজ সেই হুইলচেয়ারের চাকাগুলো আর সীমাবদ্ধতার প্রতীক নয়, বরং সেগুলোই এখন বাছেদের সাফল্যের ডানা। আজ ফ্রিল্যান্সিং করে আবদুল বাছেদের মাসিক আয় এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা।

লড়াইয়ের শুরু ও শিকড়ের শক্তি

নোয়াখালীর দাগনভূঞার আতাতুর্ক মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে প্রাথমিক শেষ করে বাছেদের স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ২০১৫ সালে একই স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করার পর চোখে ছিল রঙিন ভবিষ্যৎ। কিন্তু ২০১৮ সালে চৌমুহনী সরকারি এসএ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার আগে সেই দুর্ঘটনা এসে হানা দেয়। জীবনের একটি বছর থমকে গিয়েছিল হাসপাতালের বিছানায়, কিন্তু বাছেদ দমে যাননি। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে ২০২৩ সালে ফেনী সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক (বিএসএস) ডিগ্রি সম্পন্ন করেন তিনি।

এই দীর্ঘ লড়াইয়ে বাছেদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর পরিবার। বাবা সাহাব উদ্দিন দীর্ঘকাল প্রবাসে থেকে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন সন্তানের সোনালি ভবিষ্যতের জন্য। মা সেতারা আক্তার ছায়া দিয়েছিলেন বাছেদকে। বড় ভাই ইমরান হোসেন ও ছোট ভাই আবু জাফর—দুজনই বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত। মেজ ভাই বাছেদের স্বপ্ন পূরণে তাঁরাও ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। আর ছোট বোন হেবা বিনতে সাহাব, যিনি এখন স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষে পড়ছেন, তাঁর কাছেও বাছেদ এক অনুপ্রেরণার নাম।

অন্ধকার গলি ও বাস্তবতার দেয়াল

স্নাতক শেষ করার পর হুইলচেয়ারে বসে যখন চাকরির বাজারে নামলেন, বাছেদ দেখলেন নিষ্ঠুর বাস্তবতা। বেশির ভাগ অফিসই তাঁর মতো মানুষদের জন্য সহজগম্য নয়। ১০-১৫ হাজার টাকার বেতনের চাকরির জন্যও তাঁকে লড়তে হচ্ছিল অবকাঠামোগত বাধার সঙ্গে। বাছেদ বুঝতে পারলেন, চারদেয়ালের ভেতর নিজেকে আটকে না রেখে আকাশকে হাতের মুঠোয় আনতে হলে তাঁকে গতানুগতিক পথের বাইরে কিছু করতে হবে।

গেম থেকে স্বপ্ন দেখা

বাছেদ তাঁর মা আর বড় ভাইয়ের কাছে একটি কম্পিউটারের আবদার করলেন। হাতে এল শখের কম্পিউটার। শুরুতে সারা দিন গেম খেলে সময় কাটত তাঁর। কিন্তু একদিন হঠাৎই বিবেকের দংশন শুরু হলো—এভাবে কি তবে শেষ হবে জীবন?

চট্টগ্রামের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি) থেকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন ইন্টারনেটের বিশাল সমুদ্রে। শপিফাই, ওয়ার্ডপ্রেস নিয়ে শুরুতে লড়াই করলেও ঠিক জুত করতে পারছিলেন না। কিন্তু হার মানা যাঁর রক্তে নেই, তাঁকে আটকায় কে? বন্ধু আর বড় ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচিত হলেন গুগল অ্যাডস ও গুগল মার্চেন্ট সেন্টারের সঙ্গে। ২০২১ সালের শেষে স্কিলআপারের মেন্টর শামীম হুসাইনের হাত ধরে শুরু হলো তাঁর আসল যুদ্ধের প্রস্তুতি।

Tags: হুইলচেয়ার বসে বাছেদ ফ্রিল্যান্সিং আয় লাখ টাকার ওপরে