ছোট পর্দার তুমুল জনপ্রিয় অভিনেতা জিয়াউল হক পলাশকে দর্শক চেনেন মূলত ‘কাবিলা’ নামে। তাঁর প্রতিটি সংলাপে দর্শক হাসেন, তাঁর পর্দার উপস্থিতি মানেই একরাশ আনন্দ। কিন্তু এই হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ লড়াই, প্রত্যাখ্যান আর এক ভয়াবহ পারিবারিক ট্র্যাজেডির গল্প। সম্প্রতি একটি টেলিভিশন রিয়েলিটি শো (Reality Show)-তে নিজের জীবনের সেই অন্ধকার ও কঠিন অধ্যায় নিয়ে মুখ খুলেছেন এই অভিনেতা।
মেধাতালিকা থেকে ব্যর্থতার অতলে পলাশের শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল ঈর্ষণীয়। রাজধানীর নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন মেধাতালিকায় (Merit List) তৃতীয় হয়ে। সবার প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। কিন্তু ২০০৯ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনটি পলাশ ও তাঁর পরিবারের জন্য বিভীষিকা হয়ে আসে। যে ছেলেটি সবসময় প্রথম সারিতে থাকত, সে-ই কি না অকৃতকার্য হয়েছে—এই খবরটি মেনে নেওয়া পলাশের পরিবারের জন্য ছিল অসম্ভব।
মায়ের অসুস্থতা ও চার বছরের নীরবতা পলাশ জানান, তাঁর এই ব্যর্থতার খবর পাওয়ার পর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি খান তাঁর মা। ছেলের অকৃতকার্য হওয়ার সংবাদ শুনেই মায়ের ‘Brain Stroke’ (ব্রেন স্ট্রোক) হয়। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর ছিল যে, এরপর টানা চার বছর তিনি কোমায় (Coma) ছিলেন। পলাশ বলেন, “জীবনের সেই সময়টা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ। নিজের ব্যর্থতার কারণে মাকে এমন অবস্থায় দেখা যে কতটা যন্ত্রণার, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।” এই ঘটনা পলাশের মানসিক জগতকে ওলটপালট করে দেয়। তিনি নিজেকে স্বাভাবিক জীবন থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন।
অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরা মায়ের অসুস্থতা এবং সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে পলাশ বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিত পরিমণ্ডল থেকে দূরে সরে যান। কলেজে ভর্তি হলেও তাঁর পড়াশোনায় মন ছিল না, নিয়মিত হতে পারেননি ক্লাসেও। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও তিনি আশানুরূপ ফলাফল করতে ব্যর্থ হন। তবে জীবন যেখানে থমকে যাওয়ার কথা ছিল, সেখান থেকেই নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি।
তিতুমীর কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করার পর পলাশ নির্মাণের জগতে পা রাখেন। কিংবদন্তি নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘Assistant’ (সহকারী) হিসেবে শুরু হয় তাঁর পেশাদার কর্মজীবন (Career)। সেখানেও শুরুতে তাঁকে বারবার ‘Rejection’ বা প্রত্যাখ্যানের সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু ফেলে আসা জীবনের সেই ট্র্যাজেডি তাঁকে মানসিকভাবে এতটা শক্ত করে তুলেছিল যে, কোনো বাধাই তাঁকে থামাতে পারেনি।
ব্যর্থতাই যখন প্রেরণা অভিনয় ও নির্মাণ—দুই জায়গাতেই আজ পলাশ এক প্রতিষ্ঠিত নাম। তবে তিনি মনে করেন, আজকের এই সাফল্যের বীজ বোনা হয়েছিল সেই ২০০৯ সালের ব্যর্থতার দিনটিতেই। পলাশ বিশ্বাস করেন, জীবনে বাদ পড়ে যাওয়া মানেই সব শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বরং সেই ব্যর্থতাই হতে পারে সাফল্যের সবচেয়ে বড় ‘Inspiration’ বা প্রেরণা।
জিয়াউল হক পলাশের এই জীবনগল্প কেবল একজন অভিনেতার উত্থানের কাহিনি নয়, বরং এটি ভেঙে পড়া প্রতিটি মানুষের জন্য এক অনন্য লড়াইয়ের দলিল। তাঁর এই সংগ্রাম প্রমাণ করে যে, জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয় থেকেও সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব, যদি লক্ষ্য স্থির থাকে।