• দেশজুড়ে
  • রেশনের চালে বড় কাটছাঁট: অর্থসংকটে রোহিঙ্গাদের পাতে টান, বাড়ছে হাহাকার ও নিরাপত্তা ঝুঁকি

রেশনের চালে বড় কাটছাঁট: অর্থসংকটে রোহিঙ্গাদের পাতে টান, বাড়ছে হাহাকার ও নিরাপত্তা ঝুঁকি

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
রেশনের চালে বড় কাটছাঁট: অর্থসংকটে রোহিঙ্গাদের পাতে টান, বাড়ছে হাহাকার ও নিরাপত্তা ঝুঁকি

দাতা সংস্থার তহবিল সংকটে তিন স্তরে ভাগ হলো রোহিঙ্গাদের মাসিক সহায়তা; ১২ ডলারের পরিবর্তে অনেক পরিবার পাচ্ছে মাত্র ৭ ডলার, পুষ্টিহীনতা ও অপরাধ বৃদ্ধির আশঙ্কা ক্যাম্পজুড়ে।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে দীর্ঘ সাত বছর ধরে চলা মানবিক সহায়তার ইতিহাসে এক নতুন ও উদ্বেগজনক অধ্যায় শুরু হলো। বৈশ্বিক অর্থসংকট ও আন্তর্জাতিক দাতা গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রভাবে এবার রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তায় বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছে। বুধবার (১ এপ্রিল) থেকে কার্যকর হওয়া নতুন বণ্টন পদ্ধতিতে রোহিঙ্গাদের মাসিক রেশনকে তিনটি পৃথক ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে, যা নিয়ে উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বিরাজ করছে চরম অসন্তোষ ও মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা।

সাহায্যের নতুন সমীকরণ: ৭, ১০ ও ১২ ডলারের ফাঁদ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) পরিচালিত এই নতুন সহায়তা কর্মসূচিতে আগের ১২ ডলারের ফ্লাট রেট পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে। এখন থেকে পরিবারগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে ৩টি ক্যাটাগরিতে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ১৭ শতাংশ পরিবার পাচ্ছে মাথাপিছু ৭ ডলার। এছাড়া ৫০ শতাংশের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১০ ডলার এবং বাকি ৩৩ শতাংশ অতি-ঝুঁকিপূর্ণ (শারীরিক অক্ষম বা নারী-নেতৃত্বাধীন) পরিবারের জন্য বরাদ্দ ১২ ডলার।

ক্যাম্পের বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই ‘Need-based’ বা প্রয়োজনভিত্তিক বণ্টন পদ্ধতিটি বাস্তবে তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। আগে যেখানে ডাল, চিনি, তেল ও লবণসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর উপাদানের সমাহার থাকত, সেখানে বর্তমান বাজেটে অনেক পরিবারকে কেবল চাল ও সামান্য তেল নিয়ে ফিরতে হচ্ছে।

আর্তনাদ ও অনিশ্চয়তার গল্প উখিয়ার ৩ নম্বর ক্যাম্পের প্রবীণ বাসিন্দা রমজান আলী (৬৩)। ১২ জনের বিশাল পরিবার নিয়ে আগে কোনোমতে দিন পার করলেও এখন ৭ ডলারের রেশনে চোখে অন্ধকার দেখছেন তিনি। তিনি ক্ষোভের সাথে জানান, “ঘরে উপার্জনের লোক নেই, ক্যাম্পের বাইরে গিয়ে কাজ করার অনুমতিও নেই। এই সামান্য ৭ ডলারে আমাদের পরিবার কীভাবে বাঁচবে?”

একই ক্যাম্পের গর্ভবতী নারী রায়জু (২০) শোনালেন আরও করুণ চিত্র। আগে ১২ ডলারের রেশনে ৩ কেজি চিনি, ৩ কেজি ডাল এবং ৩৯ কেজি চাল পেতেন। কিন্তু এবার তাঁর ভাগে জুটেছে মাত্র ২৬ কেজি চাল ও সামান্য তেল। পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে থাকা এই তরুণী প্রশ্ন তোলেন, “আমি সন্তানসম্ভবা, এই সামান্য খাবার দিয়ে পুরো মাস কীভাবে চলব?”

নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অপরাধ প্রবণতার আশঙ্কা খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার জোরালো আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সাধারণ রোহিঙ্গা ও বিশেষজ্ঞরা। ক্যাম্প ৪-বি ব্লকের মোহাম্মদ ইদ্রিস জানান, অভাবের তাড়নায় মানুষ এখন চুরি, ছিনতাই কিংবা পাচারের মতো Criminal Activities-এর দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। এর আগে বাইরে কাজ করতে গিয়ে অপহরণের শিকার হওয়া তাঁর এক স্বজনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ক্যাম্পের নিরাপত্তা এবং বাসিন্দাদের পেটের ক্ষুধা—দুটিই এখন বড় সংকটের মুখে।

ত্রাণ কমিশনের বক্তব্য: ফান্ডিং ক্রাইসিস ও বাস্তবতা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (RRRC) মো. মিজানুর রহমান জানান, ২০১৭ সালের পর থেকে বড় আকারের যে মানবিক অপারেশন চলছিল, আন্তর্জাতিক অর্থায়নে ঘাটতি পড়ায় তা এখন সীমিত করতে হচ্ছে। তিনি জানান, ২০২৪ সালের Joint Response Plan (JRP)-এর আওতায় যেখানে ৯০০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন ছিল, সেখানে প্রাপ্ত সহায়তা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২৫ সালে তা ৪০০ মিলিয়নে নেমে আসায় বাধ্য হয়েই এই ‘নিড-বেসড’ পদ্ধতি চালু করতে হয়েছে।

কমিশনারের মতে, ইউএনএইচসিআর (UNHCR)-এর ডাটাবেজ ব্যবহার করে কর্মক্ষম সদস্য থাকা পরিবারগুলোকে অপেক্ষাকৃত কম সহায়তার তালিকায় রাখা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এই Funding Crisis সমাধানে এগিয়ে না আসে, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

প্রত্যাবাসনই কি একমাত্র সমাধান? রেশন কমানোর প্রতিবাদে টেকনাফের ২৪ নম্বর ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা ইতিমধ্যেই মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। তাঁদের দাবি স্পষ্ট—হয় সম্মানজনক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক, না হয় মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হোক। বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গাদের এই খাদ্যসংকট কেবল স্থানীয় ক্যাম্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তায় এক নতুন উদ্বেগের জন্ম দিতে পারে।

Tags: food aid human rights rohingya crisis coxsbazar news security risk wfp bangladesh funding crisis refugee camps global aid malnutrition