মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করলে বিশ্বজুড়ে যে আশঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হয়, তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ‘হরমুজ প্রণালী’। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া। এশিয়ার সিংহভাগ দেশ যখন এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শঙ্কিত এবং নাগরিকদের জ্বালানি সাশ্রয়ের পরামর্শ দিচ্ছে, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে বেইজিংয়ে। চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান মুখপত্র গর্বের সঙ্গেই জানাচ্ছে যে, দেশটির নিজস্ব ‘শক্তির ভান্ডার’ বা Energy Security এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে সুসংহত।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী অচল হয়ে পড়লেও চীন কেবল টিকে থাকবে না, বরং অন্য আমদানিকারক দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকবে। এই সক্ষমতার নেপথ্যে রয়েছে বেইজিংয়ের কয়েক দশকের সুদূরপ্রসারী নীতিগত পদক্ষেপ।
বৈদ্যুতিক গাড়ির বিপ্লব ও তেলের চাহিদা হ্রাস চীনের এই জ্বালানি স্বনির্ভরতার প্রধান স্তম্ভ হলো ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) বা বৈদ্যুতিক গাড়ির অভাবনীয় উত্থান। ২০২০ সালে বেইজিং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল যে, ২০২৫ সালের মধ্যে নতুন গাড়ির ২০ শতাংশ হবে বৈদ্যুতিক। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে গত বছরই দেখা গেছে, নতুন বিক্রিত গাড়ির প্রায় অর্ধেকই ইভি।
ফিনল্যান্ডের ‘সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার’-এর তথ্যমতে, গত বছর চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহারের ফলে যে পরিমাণ তেল সাশ্রয় হয়েছে, তা সৌদি আরব থেকে আমদানিকৃত তেলের প্রায় সমান। অর্থাৎ, চীনের পরিবহন খাত এখন আর পুরোপুরি অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি বেইজিংয়ের জন্য একটি বড় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করেছে।
সুরক্ষিত বিদ্যুৎ গ্রিড ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি চীনের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা বা Power Grid এখন মূলত দেশীয় কয়লা এবং দ্রুত বর্ধনশীল Renewable Energy বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্বারা পরিচালিত। চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌর ও বায়ুশক্তি উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রতি বছর দেশটির বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় পুরোটাই পূরণ হচ্ছে এই পরিচ্ছন্ন জ্বালানি থেকে। ফলে উপকূলীয় প্রদেশগুলোতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) আমদানির প্রয়োজনীয়তাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দেশীয় এই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিদেশ থেকে আসা জীবাশ্ম জ্বালানির ধাক্কা সামলাতে চীনের জন্য একটি শক্তিশালী বর্ম হিসেবে কাজ করছে।
সরবরাহের বৈচিত্র্যকরণ ও ‘কৌশলগত মজুত’ জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় দেশগুলো যেখানে ৮০ শতাংশ তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল, চীন সেখানে অনেক বেশি কৌশলী। চীন মূলত আটটি ভিন্ন দেশ থেকে তেল সংগ্রহ করে, যার মধ্যে রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং ইরানের মতো দেশ রয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশগুলো থেকে ছাড়মূল্যে তেল কেনায় চীনের জুড়ি নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চীনের ‘Strategic Petroleum Reserve’ (SPR) বা কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত। সঠিক পরিমাণটি বেইজিং গোপন রাখলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাণিজ্যিক মজুতসহ চীনের কাছে বর্তমানে যে পরিমাণ তেল গচ্ছিত আছে, তা দিয়ে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলেও টানা সাত মাস দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব।
দেশীয় উৎপাদন ও পাইপলাইন নেটওয়ার্ক জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চীন দেশীয় উৎপাদনকেও রেকর্ডে নিয়ে গেছে। গত বছর চীন দৈনিক ৪.৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করেছে, যা মোট চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ। তেলের পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও চীন এখন সমুদ্রপথের পরিবর্তে স্থলপথের পাইপলাইন নেটওয়ার্কে (Pipeline Network) জোর দিচ্ছে। রাশিয়া, মধ্য এশিয়া ও মিয়ানমার থেকে আসা এই পাইপলাইনগুলো মালাক্কা বা হরমুজের মতো বিতর্কিত নৌপথের ঝুঁকি এড়াতে সহায়তা করছে। এছাড়া ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ প্রকল্পের কাজ শেষ হলে রাশিয়ার সঙ্গে চীনের জ্বালানি সম্পর্ক আরও উচ্চমাত্রায় পৌঁছাবে।
আগামীর চ্যালেঞ্জ ও স্থিতিশীলতা রাইস্ট্যাড এনার্জির তেল ও গ্যাস গবেষণা বিভাগের বিশ্লেষকদের মতে, চীনের তেলের চাহিদা সম্ভবত এ বছরই তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে (Peak Demand) পৌঁছে যাবে এবং এরপর তা কমতে শুরু করবে। এর ফলে আমদানির ওপর নির্ভরতা থাকলেও ভবিষ্যতে পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
সার্বিকভাবে, সমুদ্রপথে জীবাশ্ম জ্বালানি আসার পথ রুদ্ধ হলেও চীন তার নিজস্ব বিকল্প জ্বালানি এবং অভ্যন্তরীণ মজুতের ওপর ভর করে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করেছে। কয়েক দশকের পরিকল্পনা আজ বেইজিংকে একটি শক্তিশালী ‘এনার্জি ইমিউনিটি’ প্রদান করেছে, যা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে চীনের জন্য এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক বিজয়।