লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের চেনা জগতটা যে এভাবে মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুর মঞ্চ হয়ে উঠবে, তা কল্পনাও করতে পারেনি টলিউড। ওড়িশার তালসারি সমুদ্রসৈকতে শুটিং চলাকালীন অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সলিল সমাধি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং বিনোদন জগতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারাটাকেই সামনে এনে দিয়েছে। বিচ্ছেদ থাকলেও, ব্যক্তিগত অভিমান সরিয়ে রেখে রাহুলের মৃত্যুর বিচারে এবার কঠোর অবস্থান নিলেন তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী, অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার।
ন্যায়ের দাবিতে আইনি পদক্ষেপ ও এফআইআর রাহুলের অকাল মৃত্যুর পর থেকেই উত্তাল স্টুডিও পাড়া। অভিযোগ উঠেছে, শুটিং সেটে প্রয়োজনীয় Safety Measures বা নিরাপত্তা বলয় পর্যাপ্ত ছিল না। সেই প্রেক্ষাপটেই বুধবার (১ এপ্রিল) সংশ্লিষ্ট প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন প্রিয়াঙ্কা সরকার। তাঁর দায়ের করা এফআইআর (FIR) এখন কেবল একটি আইনি নথি নয়, বরং সহকর্মীর প্রতি সহকর্মীর এবং স্বামীর প্রতি স্ত্রীর শেষ দায়বদ্ধতার লড়াই। প্রিয়াঙ্কার স্পষ্ট দাবি, কার গাফিলতিতে একজন প্রাণবন্ত অভিনেতা মাঝসমুদ্রে তলিয়ে গেলেন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
প্রসেনজিতের বাসভবনে জরুরি বৈঠক ও টলিপাড়ার ক্ষোভ রাহুলের মৃত্যুর পর অভিনেতাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরব হয়েছে 'আর্টিস্ট ফোরাম'। গত মঙ্গলবার প্রবীণ অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বাসভবনে এক জরুরি বৈঠকে বসেন টলিউডের প্রথম সারির শিল্পী ও কলাকুশলীরা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রিয়াঙ্কা সরকার নিজেও। সভায় ইন্ডাস্ট্রিজুড়ে 'Workplace Safety' এবং 'Safety Protocols' কঠোরভাবে মেনে চলার দাবি জানানো হয়। প্রযোজনা সংস্থা যদি যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে প্রয়োজনে গোটা ইন্ডাস্ট্রিজুড়ে 'Workplace Boycott' বা কর্মবিরতির মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও তদন্তের গতিপ্রকৃতি পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার কারণে রাহুলের ফুসফুসে অতিরিক্ত পানি জমে গিয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং পরিস্থিতির পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণে বেশ কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যেই শুটিং ইউনিটের ১০-১২ জনকে জেরা করেছে। প্রশ্ন উঠছে, উত্তাল সমুদ্রে শুটিং করার সময় কেন বিশেষজ্ঞ লাইফগার্ড বা লাইফ জ্যাকেটের মতো জরুরি ব্যবস্থা রাখা হয়নি? কেন সংশ্লিষ্ট Production House এই চরম অব্যবস্থার দায় এড়াতে চাইছে?
শিল্পীদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের লড়াই রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ট্র্যাজিক প্রয়াণ টলিউডের পেশাদারিত্বকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। শিল্পীদের অভিযোগ, গ্ল্যামারের আড়ালে অনেক সময়ই পরিকাঠামোগত নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করা হয়। প্রিয়াঙ্কা সরকারের এই আইনি লড়াই তাই কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং ইন্ডাস্ট্রির প্রতিটি কর্মীর জীবন সুরক্ষার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। আইনি নোটিশ পাঠানোর পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রি এখন তাকিয়ে আছে পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
রহস্যের জট খুলবে কি? উদ্ধারকাজ নিয়ে দ্বৈত বয়ান এবং প্রযোজনা সংস্থার রহস্যজনক নীরবতা সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করছে। তালসারির সেই কালো দিনটি কি শুধুই একটি দুর্ঘটনা ছিল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে চরম অবহেলা? প্রিয়াঙ্কা সরকারের এই সাহসী পদক্ষেপ এবং আর্টিস্ট ফোরামের কঠোর অবস্থান হয়তো খুব দ্রুতই এই রহস্যের পর্দা উন্মোচন করবে।