দেশে নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হামের (Measles) প্রাদুর্ভাব। দেশের অন্তত ১০টি জেলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই সংক্রামক ব্যাধি। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩০ মার্চ পর্যন্ত সারাদেশে ৭৬৪ জন হামে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং এর মধ্যে বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। তবে সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, আক্রান্তদের একটি বড় অংশই শিশু, যাদের বয়স এখনো টিকাদানের আওতাভুক্ত হয়নি। এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের প্রচলিত বয়সসীমা কমিয়ে বিশেষ ক্যাম্পেইন (Special Campaign) শুরুর পরামর্শ দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
৯ মাসের নিচের শিশুদের ঝুঁকি ও ভ্যাক্সিনেশন চ্যালেঞ্জ
জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী, শিশুদের জন্মের ৯ মাস পূর্ণ হলে হামের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ প্রদান করা হয়। কিন্তু বর্তমান আউটব্রেক (Outbreak) বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশেরই বয়স ৯ মাসের নিচে। অর্থাৎ, নিয়ম অনুযায়ী তারা এখনো জীবনের প্রথম হামের টিকা বা প্রথম ডোজ পাওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠেনি।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. শ্রীবাস পাল এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমাদের ক্লিনিক্যাল এনালাইসিসে (Clinical Analysis) দেখা গেছে, অধিকাংশ শিশুই টিকা পাওয়ার আগেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নীতি-নির্ধারকদের উচিত অতি-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ৯ মাসের পরিবর্তে ৬ মাস বয়স থেকেই বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা।”
বিশেষ ক্যাম্পেইন ও বয়সসীমা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ৬ মাস বয়সের শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার কার্যকারিতা নিয়ে ইতিপূর্বেও গবেষণা হয়েছে এবং সেখানে অত্যন্ত সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়া গেছে। তাই বর্তমান প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে ‘রুটিন ভ্যাক্সিনেশন’ (Routine Vaccination)-এর পাশাপাশি এক মাসের একটি বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম বা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, “আমাদের দেশে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে ৬ মাস বয়স থেকেই শিশুদের হামের টিকা দেওয়া সম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৬ থেকে ১৫ মাস বয়সী সকল শিশুদের জন্য একটি বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেওয়া জরুরি। এমনকি যারা নির্দিষ্ট সময়ে টিকা পাননি বা বাদ পড়েছেন, তাদেরও এই বিশেষ আওতায় আনতে হবে।”
মায়ের ইমিউনিটি ও দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা
হামের এই আকস্মিক বিস্তারের পেছনে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি (Immunity) কমে যাওয়াকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডা. বেনজীর আহমেদ আরও উল্লেখ করেন যে, নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মূলত গর্ভাবস্থায় মায়ের দেহ থেকে আসে। যদি মায়েদের শরীরেই পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি না থাকে, তবে শিশুরা হামের মতো রোগের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। তাই কম বয়সে হাম সংক্রমণ রোধে গর্ভাবস্থায় মায়েদের পুষ্টি ও সচেতনতার ওপরও জোর দিচ্ছেন তিনি।
সরকারি তৎপরতা ও লজিস্টিক সাপোর্ট
হামের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানানো হয়েছে। গত ৩০ মার্চ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকেই সারাদেশে হামের টিকা সরবরাহ জোরদার করা হবে। এই উদ্দেশ্যে সরকার ইতিমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভ্যাকসিন ইমপোর্ট (Vaccine Import) করে টিকাদান কর্মসূচিকে আরও গতিশীল করতে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি এই লজিস্টিক সাপোর্ট (Logistic Support) এবং টিকাদানের বয়সসীমা পুনর্নির্ধারণের সাহসী সিদ্ধান্তই পারে দেশের এই ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব থেকে শিশুদের রক্ষা করতে।