দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে বইছে যুদ্ধের উত্তপ্ত হাওয়া। ডুরান্ড লাইনকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে শুরু হওয়া সীমান্ত সংঘাত এখন চরম আকার ধারণ করেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ আফগান তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে কার্যত ‘Open War’ বা প্রকাশ্য যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। দুই পক্ষই দাবি করছে বিশাল ক্ষয়ক্ষতির। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববাসীর নজর এখন দেশ দুটির সামরিক সক্ষমতার দিকে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘International Institute for Strategic Studies’ (IISS)-এর তথ্যমতে, শক্তির বিচারে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান বিদ্যমান।
কৌশলগত অবস্থান ও আধুনিকায়ন: চীন-নির্ভরতা বনাম জরাজীর্ণ উত্তরাধিকার পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী কেবল সংখ্যায় বড় নয়, বরং প্রযুক্তির দিক থেকেও অনেক এগিয়ে। বেইজিংয়ের সঙ্গে গভীর সামরিক সম্পর্কের কারণে পাকিস্তান নিয়মিত উন্নত সরঞ্জাম ও ‘Defense Technology’ লাভ করে। দেশটি বর্তমানে তাদের নৌ ও বিমান বাহিনীকে আধুনিকীকরণের পাশাপাশি ‘Nuclear Program’-এ ব্যাপক বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে।
অন্যদিকে, ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর আফগান তালেবান বিপুল পরিমাণ মার্কিন ও বিদেশি সামরিক সরঞ্জাম হাতে পেলেও সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারছে না। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাব এবং খুচরা যন্ত্রাংশের সংকটে তাদের ‘Defense System’ ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাদের হাতে থাকা বেশিরভাগ সরঞ্জামই এখন জরাজীর্ণ সোভিয়েত আমলের অবশিষ্টাংশ।
সেনাবাহিনীর বিশালত্ব: ৬.৬ লাখ বনাম ১.৭২ লাখ জনবলের বিচারে পাকিস্তান বহুগুণ শক্তিশালী। পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীতে সক্রিয় সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার। এর মধ্যে মূল সেনাবাহিনীতেই (Army) রয়েছে ৫ লাখ ৬০ হাজার সদস্য। এছাড়া বিমান বাহিনীতে ৭০ হাজার এবং নৌবাহিনীতে ৩০ হাজার দক্ষ কর্মী নিয়োজিত।
বিপরীতে, তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগান বাহিনীর মোট সক্রিয় সদস্য সংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৭২ হাজার। যদিও তারা তাদের এই জনবলকে ২ লাখে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়েছে, তবে প্রশিক্ষিত অফিসার এবং আধুনিক কমান্ড স্ট্রাকচারের দিক থেকে তারা পাকিস্তানের চেয়ে অনেক পিছিয়ে।
রণসজ্জা: ট্যাংক, কামান ও সাঁজোয়া যান স্থলযুদ্ধের জন্য পাকিস্তানের হাতে রয়েছে ৪ হাজার ৬০০-এর বেশি শক্তিশালী কামান এবং ৬ হাজারেরও বেশি ‘Armored Fighting Vehicles’ বা সাঁজোয়া যুদ্ধযান। এর বিপরীতে আফগানিস্তানের হাতে থাকা সাঁজোয়া যানের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও, সেগুলো মূলত পুরনো সোভিয়েত যুগের। আধুনিক গুলন্দাজ বাহিনী বা ‘Artillery’ সক্ষমতায় আফগানরা পাকিস্তানের ধারেকাছেও নেই।
আকাশপথে আধিপত্য: পাকিস্তানের একক রাজত্ব যুদ্ধের ময়দানে সবচেয়ে বড় ব্যবধান গড়ে দিচ্ছে বিমান বাহিনী। পাকিস্তানের হাতে রয়েছে ৪৬৫টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান (F-16, JF-17 সহ) এবং ২৬০টিরও বেশি হেলিকপ্টার। এর মধ্যে শক্তিশালী ‘Attack Helicopters’ এবং ‘Transport Aircraft’ অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদিকে, আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের কোনো কার্যকর যুদ্ধবিমান নেই। তালেবানের হাতে মাত্র ৬টি ছোট বিমান এবং ২৩টি হেলিকপ্টার রয়েছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এগুলোর কয়টি ওড়ার উপযোগী, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আকাশপথের এই শূন্যতা যুদ্ধক্ষেত্রে আফগানিস্তানকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
নিউক্লিয়ার ডিটারেন্স: পাকিস্তানের তুরুপের তাস সবচেয়ে বড় এবং উদ্বেগের বিষয় হলো পাকিস্তান একটি ‘Nuclear-Armed State’। ইসলামাবাদের অস্ত্রাগারে বর্তমানে অন্তত ১৭০টি পারমাণবিক ‘Warhead’ রয়েছে, যা তাদের এক অনন্য ‘Strategic Advantage’ প্রদান করে। আফগানিস্তানের হাতে এ ধরনের কোনো মারণাস্ত্র নেই।
সারসংক্ষেপ কাগজে-কলমে এবং রণক্ষেত্রে পাকিস্তানের সামরিক শক্তি আফগানিস্তানের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী। তবে তালেবানের ‘Guerrilla Warfare’ বা গেরিলা যুদ্ধের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং ভৌগোলিক সুবিধা পাকিস্তানকেও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের বিষয়ে সতর্ক করে দিচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশীর সংঘাত শেষ পর্যন্ত কোন পথে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।