বিশ্ব ফুটবলের মহাযজ্ঞ ফিফা বিশ্বকাপের পর্দা উঠতে বাকি আর মাত্র মাস তিনেক। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে আয়োজিত হতে যাওয়া এই মেগা ইভেন্টকে ঘিরে যখন উন্মাদনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই মাঠের বাইরের ‘Geopolitics’ বা ভূ-রাজনীতি উত্তপ্ত করে তুলছে ফুটবল অঙ্গনকে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থা এবং ওয়াশিংটন-তেহরান কূটনৈতিক বৈরিতার জেরে প্রশ্ন উঠেছে—আসন্ন বিশ্বকাপে কি দেখা যাবে ইরানকে? এই জল্পনার মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া এবং কিছুটা তাচ্ছিল্যভরা মন্তব্য করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান বিশ্বকাপে অংশ নিল কি না, তা নিয়ে তিনি বিন্দুমাত্র চিন্তিত নন।
ট্রাম্পের ‘বিস্ফোরক’ মন্তব্য ও ইরানের অবস্থান সম্প্রতি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘Politico’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে নিজের উদাসীনতা প্রকাশ করেন। তিনি সরাসরি বলেন, “আমার সত্যিই কিছু যায় আসে না ইরান এই আসরে অংশ নিল কি না। ইরান বর্তমানে একটি বিধ্বস্ত দেশ, তাদের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অবস্থা এখন অত্যন্ত নাজুক।” ট্রাম্পের এই মন্তব্যে মূলত ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধের ছায়া ও ফিফার প্রস্তুতি সভায় অনুপস্থিতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্মিলিতভাবে ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে, যার পাল্টা জবাব দিচ্ছে তেহরানও। এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় বিশ্বকাপ অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে নিয়ে ফিফার একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘Planning Meeting’ বা পরিকল্পনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিস্ময়করভাবে, সেই সভায় একমাত্র অনুপস্থিত দেশ ছিল ইরান। এরপরই গুঞ্জন জোরালো হয় যে, ইরান হয়তো প্রতিবাদস্বরূপ বা নিরাপত্তাজনিত কারণে এবারের বিশ্বকাপ বর্জন করতে পারে।
ইরান ফুটবল ফেডারেশনের প্রতিক্রিয়া ট্রাম্পের এমন নেতিবাচক মনোভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান মারমুখী অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছেন ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদি তাজ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর বর্তমান রণংদেহী অবস্থান কোনোভাবেই বিশ্বকাপের স্পোর্টসম্যানশিপের সঙ্গে যায় না। এটি ফুটবলের মতো একটি বিশ্বজনীন উৎসবের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক সংকেত।
মাঠের লড়াই ও গ্রুপ সমীকরণ ২০২৬ বিশ্বকাপের এশীয় অঞ্চলের বাছাইপর্বে গ্রুপ ‘এ’-তে শীর্ষস্থান দখল করে টানা চতুর্থবারের মতো মূল আসরে জায়গা করে নিয়েছে ইরান। এবারের আসরে তারা রয়েছে গ্রুপ ‘জি’-তে (Group G), যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে শক্তিশালী বেলজিয়াম, মিশর ও নিউজিল্যান্ড। ফিফার নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ইরানের গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
আইনি জটিলতা ও ট্রাভেল ব্যান গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে জারি করা কঠোর ‘Travel Ban’ বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ইরানের নাম থাকলেও, ফিফার অনুরোধে খেলোয়াড় এবং অফিশিয়ালদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ছাড় বা ‘Visa Process’ কতটা মসৃণ হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফুটবলের আঙিনায় রাজনীতির এই অনুপ্রবেশ শেষ পর্যন্ত ইরানকে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।