আসন্ন সংসদ অধিবেশনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (NCP) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে ‘ফ্যাসিস্টের অবশিষ্টাংশ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে অবিলম্বে তাকে অপসারণ ও গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহী নগরীর সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ মাঠে এনসিপি আয়োজিত বিভাগীয় ইফতার ও দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন।
সংসদ অধিবেশন ও রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে বিতর্ক আগামী ১২ মার্চ থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন সংসদের অধিবেশন নিয়ে নিজের আপসহীন অবস্থানের কথা জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা শুনতে পাচ্ছি, ওই দিন ফ্যাসিস্ট সরকারের রেখে যাওয়া লেজুড় রাষ্ট্রপতি সংসদে বক্তব্য রাখবেন। আমরা পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই, কোনো ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রপতির ভাষণ শোনার জন্য আমরা সংসদে যাচ্ছি না। আমাদের লক্ষ্য সংসদীয় ‘Reform’ বা সংস্কার আদায় করা। আমরা দেখতে চাই কবে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান সংবিধান দিয়ে দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ সম্ভব নয়। তাই অবিলম্বে একটি ‘Constitution Reform Council’ বা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে।
শরীফ উসমান হাদী হত্যা ও আন্তর্জাতিক বিচার বক্তব্যে শরীফ উসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, এই হত্যার বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হতে হবে। ভারতে গ্রেফতার হওয়া আসামিদের দ্রুত ‘Extradition’ বা প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে ন্যায়বিচার কার্যকর করার দাবি জানান তিনি। তার মতে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কেবল বন্দুকধারী নয়, বরং একটি ‘Deep State’ এবং দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র জড়িত ছিল। সেই নেপথ্যের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করা এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষাব্যবস্থা ও দলীয়করণের অভিযোগ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সভাপতি পদের জন্য স্নাতক পাসের শর্ত বাতিলের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় ‘Party-politics’ বা দলীয়করণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সারজিস আলম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দেশের অগ্রগতির মেরুদণ্ড শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কোনো ধরনের রাজনৈতিক পাঁয়তারা সহ্য করা হবে না।
সরকারের বৈধতা ও ‘লন্ডন-দিল্লি’ চুক্তির তত্ত্ব এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী বর্তমান সরকারের গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি দাবি করেন, এই সরকার অগণতান্ত্রিক এবং জনগণের সরাসরি রায়ের পরিবর্তে ‘লন্ডন ও দিল্লিতে হওয়া গোপন চুক্তির’ আলোকে গঠিত হয়েছে। বর্তমান সরকার ক্রমশ ‘Authoritarianism’ বা স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঝুঁকছে বলে সতর্ক করে তিনি বলেন, “যদি আপনারা স্বৈরাচারের পথে হাঁটেন, তবে আমরা দেখব না আপনি বেগম জিয়ার ছেলে না শহীদ জিয়ার ছেলে। লড়াই হবে ফ্যাসিবাদের পক্ষের ও বিপক্ষের শক্তির মধ্যে।”
অর্থনৈতিক সংস্কার ও ফ্যামিলি কার্ড সরকারের ‘Family Card’ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও নাহিদ ইসলাম বলেন, দুর্নীতি এবং ‘Loan Default’ বা ঋণখেলাপি সংস্কৃতি বন্ধ না হলে এই ধরনের ক্ষুদ্র সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দেশের অর্থনীতিতে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। ‘Macroeconomic’ স্থিতিশীলতা ফেরাতে হলে আগে প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট বন্ধ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মন্ডলসহ ১১-দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১২ মার্চের সংসদ অধিবেশনকে কেন্দ্র করে এনসিপির এই কঠোর অবস্থান দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন কোনো নাটকীয়তার জন্ম দিতে পারে।