• দেশজুড়ে
  • ফেরির ফাঁদে বান্দরবান -রাঙামাটি সড়ক:-

ফেরির ফাঁদে বান্দরবান -রাঙামাটি সড়ক:-

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
ফেরির ফাঁদে বান্দরবান -রাঙামাটি সড়ক:-

অসীম রায় (অশ্বিনী) বান্দরবান

সেতুর অভাবে দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রাঙামাটি ও বান্দরবান তিন পাহাড়ের হাজারো মানুষকে। পার্বত্য জেলার রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের চন্দ্রঘোনা-রাইখালী অংশে কর্ণফুলী নদী পারাপারে এখনো নির্ভর করতে হচ্ছে ফেরির ওপর।

রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের চন্দ্রঘোনা-রাইখালী অংশে কর্ণফুলী নদী পারাপারে ফেরির ওপর নির্ভরতা হাজারো মানুষের জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেরি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০০-৬০০ যানবাহন পারাপার করায় দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়, যার ফলে সময়, শ্রম ও অর্থের অপচয় হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, সেতুটি নির্মিত হলে রাঙামাটি-বান্দরবান-রাজস্থলী অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাতে গতি আসবে; পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রেও সৃষ্টি হবে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।

যে পথ সেতু থাকলে মাত্র ২–৩ মিনিটে অতিক্রম করা সম্ভব হতো, সেখানে এখন সময় লাগছে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, বাড়ছে যাতায়াত ব্যয় এবং ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

স্থানীয় এক বাসচালক বলেন, ফেরির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অনেক সময় দুই–তিনটি ট্রিপ কম দিতে হয়। এতে যেমন আমাদের ক্ষতি, তেমনি যাত্রীরাও সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- জরুরি রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রে এই ফেরিনির্ভরতা বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্সকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। গুরুতর অসুস্থ রোগী নিয়ে স্বজনদের উৎকণ্ঠা চরমে পৌঁছে।

রাজস্থলীর এক বাসিন্দা জানান, রাতে বা ভোরে রোগী নিয়ে বের হলে ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সেতু থাকলে কয়েক মিনিটেই পার হয়ে যাওয়া যেত। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে।

কাপ্তাই বাঁধ থেকে পানি ছেড়ে দিলে কর্ণফুলী নদীতে স্রোত বেড়ে যায়। অতিরিক্ত স্রোতের কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। চলতি বছরও কয়েক দফায় প্রায় ১৫ দিনের মতো ফেরি সার্ভিস বন্ধ ছিল। এ সময় রাঙামাটি–বান্দরবান সড়কে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে।

ফলে যাত্রীদের বিকল্প দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথ ব্যবহার করতে হয়েছে। এ ছাড়া জোয়ারের সময় ফেরির পাটাতনে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। আবার ভাটার সময় ফেরি নিচে নেমে যাওয়ায় যানবাহন ওঠানামায় সৃষ্টি হয় ঝুঁকি। প্রায়ই গাড়ি বিকল হয়ে ফেরির ওপর আটকে থাকার ঘটনাও ঘটে।

১৯৮৯ সালে রাঙামাটি–বান্দরবান সড়কে সরাসরি যান চলাচলের লক্ষ্যে ফেরি সার্ভিস চালু হয়। তখনকার প্রেক্ষাপটে এটি ছিল যুগান্তকারি উদ্যোগ।

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় যানবাহনের সংখ্যা ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। ফলে এখন ফেরি ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে এক বড় প্রতিবন্ধকতা।

রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, সম্ভাব্যতা যাচাই ও চূড়ান্ত নকশা প্রণয়নের কার্যক্রম শেষ হয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান। তিনি বলেন, সেতুটি নির্মিত হলে রাঙামাটি-বান্দরবান-রাজস্থলী অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

স্থানীয়রা জানান, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি চন্দ্রঘোনা এলাকায় কর্ণফুলী নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ। সেতুটি বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাতে গতি আসবে; পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রেও সৃষ্টি হবে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।

এলাকাবাসীর মতে, একটি সেতু শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি হবে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সেতুবন্ধন। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিক ও কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেছেন তারা।

স্থানীয়রা আরও জানান, পরিবহন শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা দ্রুত সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এই সড়ক শুধু দুটি জেলার সংযোগ নয় পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনী।

কৃষিপণ্য, বনজ সম্পদ, ব্যবসায়িক মালামাল ও দৈনন্দিন যাতায়াত সবকিছুই এই পথে নির্ভরশীল। একটি সেতু নির্মাণ হলে সময় সাশ্রয় হবে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে এবং জরুরি সেবার মান উন্নত হবে। পার্বত্য জনপদের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সেতুর স্বপ্ন দেখে আসছেন। প্রতিদিন ফেরির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত যানবাহন যেন সেই অপূর্ণ স্বপ্নেরই প্রতিচ্ছবি। কর্ণফুলীর বুকে একটি সেতু শুধু কংক্রিট-লোহা নয় এটি হবে মানুষের সময়, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রতীক।

এখন দেখার বিষয়, কবে বাস্তবে রূপ নেবে সেই স্বপ্ন; কবে শেষ হবে ফেরির ফাঁদে আটকে থাকা রাঙামাটি–বান্দরবান সড়কের দীর্ঘশ্বাস।

তাদের মতে, এই সড়ক শুধু দুটি জেলার সংযোগ নয় এটি পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনী।