দাঁতের গোড়ায় চিনচিনে ব্যথা কিংবা হঠাৎ তীব্র যন্ত্রণা—জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। অনেক সময় আমরা একে সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাই, আবার কখনো সামান্য ব্যথাতেই বড় কোনো রোগের আশঙ্কায় বিচলিত হয়ে পড়ি। চিকিৎসকদের মতে, দাঁতের গোড়া ব্যথা মানেই যে তা প্রাণঘাতী কোনো ব্যাধি, তা কিন্তু নয়। তবে এই যন্ত্রণাকে অবহেলা করাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা অনেক সময় শরীরের গভীর কোনো সমস্যার ‘Early Warning’ বা আগাম সতর্কতা হতে পারে।
কেন হয় দাঁতের গোড়ায় ব্যথা?
দাঁতের গোড়ায় ব্যথার পেছনে একাধিক বৈজ্ঞানিক ও শারীরিক কারণ থাকতে পারে। নিচে এর প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো:
১. মাড়ির প্রদাহ বা Gingivitis: আমাদের মুখের ভেতর কয়েকশ প্রজাতির ‘Bacteria’ বাস করে। নিয়মিত পরিষ্কার না করলে মাড়িতে ব্যাকটেরিয়ার আস্তরণ বা ‘Plaque’ জমে যায়। এর ফলে মাড়ি ফুলে ওঠে এবং দাঁতের গোড়ায় অসহ্য ব্যথার সৃষ্টি হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘Gingivitis’ বলা হয়।
২. ডেন্টাল ক্যারিজ বা ক্যাভিটি: দাঁতের উপরিভাগে গর্ত বা ‘Cavity’ সৃষ্টি হলে প্রাথমিক অবস্থায় তা ধরা পড়ে না। কিন্তু যখন এই ক্ষয় দাঁতের ভেতরের সংবেদনশীল অংশ ‘Pulp’ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন ব্যথা সরাসরি দাঁতের গোড়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
৩. যান্ত্রিক আঘাত বা Mechanical Stress: অনেক সময় আমরা খুব শক্ত খাবার (যেমন হাড় বা শক্ত চকলেট) কামড় দেওয়ার চেষ্টা করি। এতে দাঁতের গোড়ায় সাময়িকভাবে প্রচণ্ড চাপ পড়ে এবং ‘Tissue’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যথা হতে পারে। এছাড়া ঘুমের মধ্যে অনেকের দাঁত কিড়মিড় করার অভ্যাস (Bruxism) থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে দাঁতের গোড়াকে দুর্বল করে দেয়।
৪. সাইনাসের জটিলতা বা Sinusitis: আশ্চর্যের বিষয় হলেও সত্যি যে, অনেক সময় দাঁতে কোনো সমস্যা না থাকলেও ব্যথা অনুভূত হতে পারে। নাকের দুপাশে থাকা সাইনাসে সংক্রমণ বা ‘Sinusitis’ হলে ওপরের পাটির দাঁতের গোড়ায় প্রচণ্ড চাপ ও ব্যথা তৈরি হয়।
৫. দাঁতের শিকড়ে ইনফেকশন বা Abscess: যদি দাঁতের গোড়া ফুলে যায় এবং সেখান থেকে পুঁজ বের হয়, তবে বুঝতে হবে শিকড়ে সংক্রমণ বা ‘Abscess’ হয়েছে। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং দ্রুত চিকিৎসা না করালে সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
কখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
সাধারণ ব্যথা ঘরোয়া প্রতিকারে অনেক সময় সেরে যায়, কিন্তু নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে ‘Dental Surgeon’-এর পরামর্শ নেওয়া জরুরি:
যদি ব্যথা একটানা ৩-৪ দিনের বেশি স্থায়ী হয়।
ব্রাশ করার সময় বা সাধারণ অবস্থায় মাড়ি থেকে রক্তপাত হলে।
দাঁত নড়বড়ে মনে হলে কিংবা মাড়ি অস্বাভাবিক ফুলে গেলে।
ব্যথার সাথে তীব্র জ্বর বা মুখমণ্ডল ফুলে গেলে।
প্রতিরোধে করণীয়: সুস্থ হাসির মূলমন্ত্র
দাঁতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘Oral Hygiene’ বা মুখগহ্বরের পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞরা কিছু নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দেন:
Proper Brushing: দিনে অন্তত দুবার ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করুন। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে ব্রাশ করা বাধ্যতামূলক।
Interdental Cleaning: দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাদ্যকণা পরিষ্কার করতে নিয়মিত ‘Flossing’ ব্যবহার করুন।
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন: অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার এবং খুব বেশি ঠান্ডা বা গরম পানীয় এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। এছাড়া ধূমপান বর্জন করা মাড়ির স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।
Regular Check-up: অন্তত প্রতি ছয় মাসে একবার অভিজ্ঞ ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে দাঁতের ‘Check-up’ করানো উচিত। এতে বড় কোনো সমস্যা হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
আপনার সুন্দর হাসিটি বজায় রাখতে দাঁতের সামান্যতম সমস্যাকেও গুরুত্ব দিন। মনে রাখবেন, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম।