মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া আল্টিমেটামের সময়সীমা শেষ হওয়ার মুখেই পাল্টা এক ভয়াবহ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করল ইরান। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাদের উপকূলীয় এলাকা বা কোনো দ্বীপে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালায়, তবে পুরো পারস্য উপসাগরে (Persian Gulf) অত্যাধুনিক নৌ-মাইন পেতে সব ধরনের নৌ-যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
সোমবার (২৩ মার্চ) ইরানি ডিফেন্স কাউন্সিলের এক বিশেষ বিবৃতিতে এই চরম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় কোনো ধরনের উসকানি বা হামলা বরদাস্ত করবে না।
মাইন স্থাপন ও জলপথ অবরুদ্ধ করার হুমকি
বিবৃতিতে ডিফেন্স কাউন্সিল উল্লেখ করেছে, “শত্রুপক্ষ যদি ইরানের উপকূল বা দ্বীপপুঞ্জে কোনো ধরনের দুঃসাহসিক আক্রমণের চেষ্টা করে, তবে পারস্য উপসাগর ও উপকূলের সমস্ত প্রবেশপথ এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথে বিভিন্ন ধরনের শক্তিশালী নৌ-মাইন (Naval Mine) বসিয়ে দেওয়া হবে।”
ইরানের দাবি অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের ফলে পুরো পারস্য উপসাগর কার্যত এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হবে এবং বিশ্বজুড়ে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ রুটটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ (Blockade) হয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতির ফলে সৃষ্ট যে কোনো বৈশ্বিক সংকটের যাবতীয় দায়ভার হুমকি প্রদানকারী দেশগুলোর ওপর বর্তাবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
হরমুজ প্রণালী ব্যবহারে নতুন শর্ত
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) নিয়ে ইরানের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যেসব দেশ এই যুদ্ধের অংশীদার নয় কিংবা যারা ‘শান্তিকামী’, তাদের জন্য এই জলপথ অতিক্রম করার একমাত্র উপায় হলো ইরানের সাথে সরাসরি সমন্বয় (Coordination) করা। অর্থাৎ, ইরানের অনুমতি বা সবুজ সংকেত ছাড়া এই রুট দিয়ে জাহাজ চলাচল এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ট্রাম্পের আল্টিমেটাম ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া
এই উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে গত শনিবার, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার এক চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেন। ট্রাম্পের দাবি ছিল, ইরানকে অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করে দিতে হবে, অন্যথায় ইরানের জাতীয় গ্রিড এবং গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে ভয়াবহ হামলা চালানো হবে।
ট্রাম্পের সেই আল্টিমেটামের সময়সীমা যখন প্রায় শেষের দিকে, ঠিক তখনই ইরান এই ‘মাইন’ স্থাপনের হুমকি দিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করল। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই ‘নৌ-মাইন’ রণকৌশল মূলত একটি অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার (Asymmetric Warfare) বা অসম যুদ্ধের অংশ, যা মার্কিন নৌবাহিনীর বিশাল বহরের জন্য বড় ধরনের লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ (Logistics Challenge) তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে উদ্বেগের ছায়া
পারস্য উপসাগর দিয়ে বিশ্বের মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে নৌ-মাইন স্থাপন বা অবরুদ্ধ করার হুমকি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে ইরানের এই নতুন হুঁশিয়ারি বিশ্ব নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
আপাতত সবার নজর ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। ট্রাম্পের আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার পর আমেরিকা কোনো সামরিক অভিযানে যায় কি না, কিংবা ইরান সত্যিই পারস্য উপসাগরকে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করে কি না—তা নিয়ে বিরাজ করছে চরম অনিশ্চয়তা।