পাকিস্তান ক্রিকেটের অন্যতম পোস্টার বয় এবং গতিদানব নাসিম শাহ এবার মাঠের বাইরের এক ঘটনায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মারিয়ম নওয়াজকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিতর্কিত পোস্ট করার দায়ে এই তরুণ পেসারকে ২ কোটি পাকিস্তানি রুপি জরিমানা করেছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (PCB)। পেশাদার ক্রীড়াবিদদের জন্য নির্ধারিত ‘আচরণবিধি’ লঙ্ঘনের দায়ে এটি দেশটির ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম বড় আর্থিক দণ্ড হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চুক্তির অবমাননা ও পিসিবির কঠোর অবস্থান এক দাপ্তরিক বিবৃতিতে পিসিবি জানিয়েছে, নাসিম শাহ তাঁর ‘Central Contract’-এর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধারা লঙ্ঘন করেছেন। বোর্ড মনে করে, একজন জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেটারের কাছ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের অসংবেদনশীল মন্তব্য কাম্য নয়। এর আগে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show Cause Notice) দেওয়া হয়েছিল। শৃঙ্খলা কমিটির দীর্ঘ শুনানি শেষে এই বিপুল অঙ্কের জরিমানা চূড়ান্ত করা হয়।
বিতর্কের সূত্রপাত ও সেই ‘ডিলিটেড’ পোস্ট ঘটনার সূত্রপাত পাকিস্তান সুপার লিগের (PSL) চলতি মৌসুমের উদ্বোধনী ম্যাচকে কেন্দ্র করে। জ্বালানি সাশ্রয় ও অর্থনৈতিক সংকটের দোহাই দিয়ে পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি টুর্নামেন্টটি দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী ম্যাচে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মারিয়ম নওয়াজসহ একাধিক ভিআইপি ব্যক্তিত্ব। মুখ্যমন্ত্রীকে তখন ক্রিকেটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতেও দেখা যায়।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে পিসিবির একটি অফিশিয়াল পোস্ট ‘কোট’ করে নাসিমের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে লেখা হয়, “লর্ডসে তাঁকে রানীর মতো আচরণ করা হচ্ছে কেন?” পোস্টটি মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে গেলেও মাত্র কয়েক মিনিটের মাথায় তা মুছে ফেলা হয়।
হ্যাকিংয়ের দাবি ও নিঃশর্ত ক্ষমা বিতর্ক তুঙ্গে উঠলে নাসিম শাহ দাবি করেন, তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টটি ‘হ্যাক’ হয়েছিল এবং পরে তা উদ্ধার করা হয়েছে। শৃঙ্খলা কমিটির সামনে হাজির হয়ে তিনি এ ঘটনার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং দায়ভার চাপান তাঁর ‘Social Media Manager’-এর ওপর। পিসিবিকে জানানো হয়েছে, ওই ম্যানেজারকে ইতোমধ্যেই বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে পিসিবি এসব অজুহাতে সন্তুষ্ট হয়নি। বোর্ডের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, পেশাদারিত্ব এবং ‘Ethics’ বা নৈতিকতার প্রশ্নে কোনো প্রকার আপস করা হবে না।
নজিরবিহীন দণ্ড: কেন এত কঠোর পিসিবি? নাসিম শাহর ওপর আরোপিত এই জরিমানার অঙ্কটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি তাঁর কেন্দ্রীয় চুক্তির প্রায় আট মাসের বেতনের সমান। বর্তমানে তিনি ‘Category C’ ভুক্ত ক্রিকেটার। গত বছরও প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন অলরাউন্ডার আমের জামাল। কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে টুপিতে ‘৮০৪’ লিখেছিলেন তিনি। তবে তাঁকে জরিমানা করা হয়েছিল ১০ লাখ রুপি। সেই তুলনায় নাসিমের জরিমানার পরিমাণ প্রায় ১৬ গুণ বেশি।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান ক্রিকেটে রাজনৈতিক প্রভাব ও খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের বিষয়টি বোর্ডের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নাসিম শাহর মতো একজন ‘Tech-Savvy’ ও জনপ্রিয় ক্রিকেটারকে এই নজিরবিহীন দণ্ড দিয়ে পিসিবি কঠোর বার্তা দিতে চাইল—খেলার মাঠে বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে, শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।