ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের অর্ধেকেরও বেশি লক্ষ্যমাত্রা ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সোমবার (৩০ মার্চ) রক্ষণশীল মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'নিউজম্যাক্স'-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সমাপ্তি নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা (Timeline) উল্লেখ করতে রাজি হননি তিনি।
অভিযানের নিরিখে ‘অর্ধেক পথ’ অতিক্রম
সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, "ইরান যুদ্ধের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে আমরা অর্ধেকের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছি। তবে আমি এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট ডেডলাইন বেঁধে দিতে চাই না।" তিনি বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে জানান যে, এই 'অর্ধেক পথ' সময়কাল বা ডিউরেশনের নিরিখে নয়, বরং অর্জিত সামরিক সাফল্যের (Operational Success) মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। অর্থাৎ, সময়ের চেয়ে অভিযানের কার্যকারিতাই এখন ইসরায়েলের কাছে মূল বিবেচ্য বিষয়।
সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, এই যুদ্ধে তারা ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড বা আইআরজিসি (IRGC)-এর হাজার হাজার সদস্যকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি আরও জানান, ইরানের সামরিক অবকাঠামোর একটি বড় অংশ এবং পুরো শিল্পব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করে তা প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বড় দাবিটি এসেছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি (Nuclear Program) নিয়ে। নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইসরায়েলি হামলায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ (IAEA) এবং জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি সংস্থাগুলো ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দোরগোড়ায় পৌঁছানোর বিষয়ে ইসরায়েল ও ট্রাম্প প্রশাসনের দাবিকে সবসময় সরাসরি সমর্থন করেনি। তা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু তার বক্তব্যে অনড় থেকেছেন।
অভ্যন্তরীণ ভাঙন ও শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ
ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা (Regime) নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করে নেতানিয়াহু বলেন, "আমি মনে করি এই শাসনব্যবস্থা অচিরেই ভেতর থেকে ভেঙে পড়বে। বর্তমানে আমরা যা করছি তা হলো তাদের মিলিটারি ক্যাপাবিলিটি (Military Capability), মিসাইল ক্যাপাবিলিটি (Missile Capability) এবং পারমাণবিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে দেওয়া, যাতে তারা ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে।"
উল্লেখ্য, ইরানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের কয়েক সপ্তাহ পরেই এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। ওই বিক্ষোভে সরকারি বাহিনীর হাতে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। নেতানিয়াহুর মতে, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং ইসরায়েলি সামরিক চাপের মুখে তেহরানের বর্তমান ক্ষমতার কাঠামো বড় ধরনের অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে।
অনিশ্চিত সমাপ্তি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) এক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামরিক সক্ষমতা হ্রাসের এই দাবি একদিকে যেমন ইসরায়েলি বাহিনীর মনোবল বাড়াতে সহায়তা করছে, অন্যদিকে এটি আঞ্চলিক উত্তজনাকে আরও উসকে দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য মূলত ইরানের প্রতি একটি কঠোর সতর্কবার্তা এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিজেদের সামরিক আধিপত্য সম্পর্কে অবহিত করার একটি প্রয়াস।