মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ও আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করেই এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে ইসরাইল। দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি নাগরিকদের হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘মৃত্যুদণ্ড’ (Death Penalty) কার্যকর করার একটি বিতর্কিত বিল সোমবার (৩০ মার্চ) দেশটির পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এ পাস হয়েছে। ইসরাইলের এই পদক্ষেপকে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান দমন-পীড়নের একটি ‘আইনি রূপ’ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
নেসেটে কট্টরপন্থীদের জয় ও বির্তকিত উদ্যাপন
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি (Far-right) জোটের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল এই মৃত্যুদণ্ড আইন। সোমবার নেসেটে বিলটির ওপর ভোটাভুটি হলে তা ৬২-৪৮ ব্যবধানে পাস হয়। আইনটি পাস হওয়ার পর ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী এবং কট্টরপন্থি নেতা ইতামার বেন-গভিরকে সংসদ কক্ষেই শ্যাম্পেন দিয়ে উদ্যাপন করতে দেখা যায়। এই উল্লাসকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরাইলের চরম অবমাননা ও প্রতিহিংসার প্রতিফলন হিসেবে দেখছে বিশ্ব সম্প্রদায়।
বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ও মানবাধিকার উদ্বেগ
এই আইন পাসের পরপরই বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো একে ‘বৈষম্যমূলক’ এবং ‘মানবাধিকারের মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
১. ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (PA): ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপকে একটি ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ (Dangerous Escalation) হিসেবে নিন্দা করেছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, দখলকৃত অঞ্চলে ইসরাইলের কোনো সার্বভৌমত্ব নেই এবং এই আইন সম্পূর্ণ অবৈধ।
২. হামাস: ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস এই আইনকে একটি ‘বিপজ্জনক নজির’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, এটি ইসরাইলি কারাগারে বন্দি হাজার হাজার ফিলিস্তিনির জীবনকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলবে।
৩. ফিলিস্তিনি মানবাধিকার কেন্দ্র (PCHR): গাজা-ভিত্তিক এই সংস্থাটি বলেছে, এটি আইনের আড়ালে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ (Extrajudicial Killing) ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের মতে, ইসরাইল আন্তর্জাতিক মানবিক আইন (International Humanitarian Law) সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করছে।
৪. জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর (OHCHR): ফিলিস্তিনে অবস্থিত জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় এই বৈষম্যমূলক আইনটি অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। তারা উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে কোনো দখলদার শক্তি এই ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার রাখে না।
আইনি লড়াই ও অভ্যন্তরীণ সংকট
ইসরাইলের ভেতরেও এই আইনের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়েছে। ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর সিভিল রাইটস ইন ইসরাইল’ ইতিমধ্যে এই বিতর্কিত আইনের বিরুদ্ধে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতে (Supreme Court) আপিল করেছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, যখন গাজায় ইসরাইলি বাহিনী গণহত্যা (Genocide) চালাচ্ছে এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা চরমে পৌঁছেছে, তখন এই ধরনের আইন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
প্রেক্ষাপট ও চলমান সহিংসতা
ইসরাইলের এই আইনি পদক্ষেপ এমন এক সময় এল যখন গাজা এবং পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে বিনা বিচারে আটক রাখা হয়েছে এবং সামরিক অভিযানের নামে নিয়মিত প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মৃত্যুদণ্ড আইন পাসের মাধ্যমে ইসরাইলি প্রশাসন ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চায়, যা শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়াকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেবে।