সংগঠনটি বলছে, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, বিজ্ঞাপন আয় কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সংবাদপত্র শিল্প বর্তমানে বড় ধরনের সংকটে রয়েছে।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক্-বাজেট আলোচনায় নোয়াবের নেতারা এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান।
নোয়াবের পক্ষে সংগঠনের সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন। আলোচনায় প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, সংবাদ সম্পাদক ও প্রকাশক আলতামাশ কবিরসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
নিউজপ্রিন্টে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি
নোয়াবের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংবাদপত্রের প্রধান কাঁচামাল নিউজপ্রিন্ট আমদানির ওপর বর্তমানে ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর এবং সাড়ে ৭ শতাংশ আগাম কর দিতে হয়। পরিবহনসহ অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হলে কাগজের ল্যান্ডেড কস্ট প্রায় ১৩০ থেকে ১৩২ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়ায়।
নোয়াব বলছে, সংবাদপত্র শিল্প আমদানিনির্ভর হওয়ায় কাগজের দাম বাড়লে সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। ছয় মাস আগে আমদানিকৃত কাগজের প্রতি টনের দাম ছিল প্রায় ৫৬০ ডলার, যা বর্তমানে বেড়ে ৬৩০ ডলারে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় নিউজপ্রিন্টের ওপর আরোপিত শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিজ্ঞাপন আয়ে উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব
নোয়াব জানায়, সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর বর্তমানে ৫ শতাংশ উৎসে কর এবং কাঁচামাল আমদানির ওপর ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। কিন্তু অনেক সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানের মোট লাভই ১০ শতাংশের কম হওয়ায় এই করের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বছরের শেষে অনেক ক্ষেত্রেই অগ্রিম কর সমন্বয় করা যায় না, ফলে প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থের ওপর চাপ তৈরি হয়। তাই এ দুটি করহার কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
করপোরেট কর ১০ শতাংশ করার দাবি
নোয়াবের দাবি, সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্তমানে অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতোই ২৭.৫ শতাংশ করপোরেট কর দিতে হয়। অথচ রফতানিমুখী বা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অনেক শিল্পে ১০ থেকে ১২ শতাংশ করপোরেট কর রয়েছে। তাই সংবাদপত্র শিল্পের করপোরেট কর কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া সংবাদপত্র কর্মীদের আয়কর কর্মীরাই দেবেন— এমন বিধান চালুর দাবি জানিয়েছে নোয়াব। সংগঠনটি বলছে, ওয়েজ বোর্ডের বিধান অনুযায়ী কর্মীদের আয়কর প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করতে হয়, যা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
শিল্পের সংকটের কথা তুলে ধরলেন সম্পাদকরা
সভায় নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে এবং দেশে জ্বালানির সরবরাহেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে সংবাদপত্র প্রকাশনা ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, একটি পত্রিকার একটি কপি প্রকাশ করতে প্রায় ২৮ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু পাঠকসংখ্যা কমছে এবং বিজ্ঞাপন আয়ও কমে যাচ্ছে। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ বলেন, করজালের মধ্যে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই বারবার করের চাপ বাড়ানো হচ্ছে। কর-জিডিপি অনুপাতের হিসাব আরও যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, সংবাদপত্র শিল্পের করপোরেট কর বাড়ানো হবে না। তবে অন্যান্য শুল্ক ও কর বিষয়ে আগামী বাজেটে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
সংবাদপত্র শিল্পের প্রতিনিধিরা বলেন, করোনা মহামারির সময় বিভিন্ন শিল্প খাতকে প্রণোদনা দেওয়া হলেও সংবাদপত্র শিল্পকে সেই সুবিধার আওতায় আনা হয়নি। তাই আসন্ন বাজেটে এ শিল্পকে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।