জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত আলোচনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। সরকারি দলের প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনার সময় আইনমন্ত্রী তাকে ‘মিসকোট’ (Misquote) করেছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তার দাবি, সংসদীয় বিতর্কের সময় তার বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাতে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই অভিযোগ করেন।
বিতর্কের মূলে ‘সংস্কার’ বনাম ‘সংশোধন’
সংবাদ সম্মেলনে শফিকুর রহমান বলেন, “জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ নিয়ে বিধি ৬২-এর আওতায় আলোচনার সময় আইনমন্ত্রী আমার বক্তব্যকে বিকৃত করেছেন। তিনি সংসদকে জানিয়েছেন যে, উনারা সংবিধান সংশোধনের জন্য যে প্রস্তাব দিয়েছেন, আমি না কি তা গ্রহণ করেছি। এটি সম্পূর্ণ অসত্য। আমি স্পষ্টভাবে বলেছি, আমরা এখানে ‘Constitutional Reform’ বা সংবিধান সংস্কার নিয়ে কথা বলছি, কোনো নির্দিষ্ট সংশোধন বা ‘Amendment’ নিয়ে নয়।”
বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, “সংসদে দ্বিতীয়বার বক্তব্যের সুযোগ পাওয়ার পর আমি সংকট নিরসনের কথা বলেছিলাম। আমি বলেছিলাম যে, সংস্কার পরিষদ বা সংস্কার বিষয়ক কোনো কমিটি গঠন করা হলে তাকে আমরা ‘ইতিবাচক’ বা পজিটিভ হিসেবে দেখতে পারি। কিন্তু আইনমন্ত্রী আমার সেই নমনীয় অবস্থানকে ‘প্রস্তাব গ্রহণ’ হিসেবে মিসকোট করেছেন।”
কমিটির সদস্য কাঠামো ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আপত্তি
প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার কমিটি নিয়ে শফিকুর রহমান তার সুনির্দিষ্ট অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, যেকোনো কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সদস্য সংখ্যা এবং প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য থাকা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, “যদি কোনো কমিটি গঠন করা হয় এবং সেখানে উভয় পক্ষ থেকে সমান সংখ্যক সদস্য না থাকে কিংবা সংসদ সদস্যদের ‘Proportional Representation’ বা অনুপাত হারে সদস্য নির্ধারণ না করা হয়, তবে সেখান থেকে কোনো কার্যকর ‘Outcome’ আসার সম্ভাবনা নেই। আমরা চাই একটি শক্তিশালী ‘Legislative Mandate’, যা জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে। অস্পষ্টতা রেখে কোনো জাতীয় সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।”
স্পিকারের হস্তক্ষেপ ও পরবর্তী পদক্ষেপ
সংসদীয় কার্যক্রমের বর্ণনা দিয়ে শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন যে, আইনমন্ত্রীর ভুল বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ বা ‘Clarification’ দেওয়ার সুযোগ তিনি পাননি। “আমি যখন বিষয়টি স্পষ্ট করতে চাইলাম, তখন আলোচনার নির্ধারিত কর্মঘণ্টা শেষ হয়ে গিয়েছিল। মাননীয় স্পিকার জানিয়েছেন, আগামীকাল বুধবার আমাকে এই বিষয়ে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে। আমরা আশা করি, সত্যটি সংসদে প্রতিষ্ঠিত হবে।”
গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে শফিকুর রহমান বিরোধী দলের রাজনৈতিক দর্শনের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “প্রথম দিন থেকেই আমরা বলেছি আমাদের ভূমিকা হবে ‘Constructive’ বা গঠনমূলক। দেশের স্বার্থে এবং জাতির স্বার্থে সরকার যদি কোনো ভালো উদ্যোগ নেয়, আমরা অবশ্যই তাকে সমর্থন দেব। কিন্তু যদি জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন হয় কিংবা জাতীয় স্বার্থ বিনষ্ট হয়, তবে আমরা সেখানে কেবল প্রতিবাদ নয়, প্রয়োজনে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলব।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধান সংস্কারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের এই ‘যুক্তি-পাল্টা যুক্তি’ সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক হলেও, তথ্য বিকৃতির অভিযোগটি আগামী দিনের অধিবেশনে নতুন করে উত্তাপ ছড়াতে পারে। এখন সবার নজর বুধবারের অধিবেশনের দিকে, যেখানে বিরোধীদলীয় নেতা তার বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেবেন।