রাজধানীর পল্টনে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে আদালতের নির্দেশিত পুনঃতদন্ত প্রতিবেদন (Re-investigation Report) জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া আবারও পিছিয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) নির্ধারিত দিনে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (CID) প্রতিবেদন দাখিল করতে ব্যর্থ হওয়ায় আগামী ১৯ এপ্রিল পরবর্তী তারিখ ধার্য করেছেন আদালত।
ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত এই আদেশ প্রদান করেন। মামলার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল কাদির ভূঞা এদিন আদালতে কোনো প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেননি। ফলে ন্যায়বিচারের আশায় থাকা হাদির পরিবার ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের অপেক্ষা আরও দীর্ঘায়িত হলো।
তদন্তে কেন এই ‘নারাজি’? গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বক্স কালভার্ট এলাকায় নৃশংসভাবে গুলি করা হয় শরিফ ওসমান হাদিকে। এই ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (DB) তদন্ত শেষে গত ৬ জানুয়ারি ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে একটি চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করে। তবে মামলার বাদী ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের ওই তদন্তে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ডিবির তদন্তে অনেক তথ্য আড়াল করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে গত ১৫ জানুয়ারি আদালতে ‘নারাজি’ আবেদন দাখিল করা হয়। আদালত বাদীর সেই আবেদন গ্রহণ করে মামলাটি সিআইডিকে দিয়ে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ ডিবির দেওয়া আগের অভিযোগপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে গভীর রাজনৈতিক চক্রান্ত কাজ করেছে। তদন্ত কর্মকর্তার মতে, হাদির রাজনৈতিক অবস্থান ও তাঁর জ্বালাময়ী বক্তব্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ক্ষুব্ধ করেছিল। মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই তাঁকে হত্যার নীল নকশা তৈরি করা হয়। এছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং ভোটারদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করতেই ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীরা সুপরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালায়।
ঘটনার আদ্যোপান্ত: রাজপথ থেকে সিঙ্গাপুর গত ১২ ডিসেম্বর মতিঝিলে জুমার নামাজ শেষে নির্বাচনী প্রচারণা শেষ করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে যাচ্ছিলেন হাদি। দুপুর ২টা ২০ মিনিট নাগাদ পল্টন মডেল থানাধীন বক্স কালভার্ট এলাকায় তাঁর অটোরিকশাটি পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাঁকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাঁকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই তরুণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
অভিযুক্তদের বর্তমান অবস্থা এই মামলায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদকে। অভিযুক্তদের তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি ও মাসুদের পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য। ১৭ জন আসামির মধ্যে ফয়সাল করিমসহ পাঁচজন এখনো পলাতক (Absconding) রয়েছেন। অভিযুক্তদের কেউ কেউ আবার ভারতে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া এবং সিআইডির চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখন জনমনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিআইডির এই প্রতিবেদন দাখিলের ওপরই নির্ভর করছে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বিচার প্রক্রিয়া কোন দিকে মোড় নেবে।