ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে নতুন করে প্রাণঘাতী ‘নিপাহ’ (Nipah Virus) ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের বিমানবন্দরে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং বিশেষ করে ভারত থেকে আসা যাত্রীদের ওপর কঠোর স্ক্রিনিং (Screening) ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে।
পশ্চিমবঙ্গে সংক্রমণের চিত্র ও কোয়ারেন্টাইন
চলতি মাসের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের অন্তত পাঁচজন স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে নিপাহ ভাইরাসের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাৎক্ষণিকভাবে ওই স্বাস্থ্যকর্মীদের সংস্পর্শে আসা অন্তত ১১০ জনকে কঠোর কোয়ারেন্টাইনে (Quarantine) রাখা হয়েছে। ভাইরাসের সম্ভাব্য উৎস এবং সংক্রমণের বিস্তার রোধে রাজ্য স্বাস্থ্য বিভাগ ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। তবে আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্থানীয় জনমনে উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
এশিয়ার দেশগুলোতে জরুরি সতর্কবার্তা
ভারতে নিপাহ ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। থাইল্যান্ডের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে দেশটির তিনটি প্রধান বিমানবন্দরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা সকল ফ্লাইটের যাত্রীদের জন্য বিশেষ স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করেছে। এর পাশাপাশি ভারতের সীমান্তবর্তী দেশ নেপালও কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে নজরদারি কয়েক গুণ বাড়িয়েছে। নেপাল কেবল আকাশপথেই নয়, ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত স্থলবন্দরগুলোতেও কড়াকড়ি আরোপ করেছে এবং সন্দেহভাজন যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার আওতায় আনছে।
নিপাহ ভাইরাস: কেন এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক?
নিপাহ একটি জোনোটিক (Zoonotic) ভাইরাস, যা মূলত প্রাণী (যেমন বাদুড় বা শূকর) থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এই ভাইরাসের ভয়াবহতার প্রধান কারণ হলো এর উচ্চ মৃত্যুহার (Mortality Rate)। বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর সম্ভাবনা ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এখন পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসের প্রতিরোধে কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন (Vaccine) বা সুনির্দিষ্ট অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি, যা চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিশ্বজুড়ে মহামারিতে (Pandemic) রূপ নিতে পারে এমন ১০টি শীর্ষ পর্যায়ের বিপজ্জনক রোগের তালিকায় নিপাহ ভাইরাসকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। সংক্রমণের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে একে ‘পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
লক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে উপসর্গগুলো মৃদু থেকে অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে। প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
তীব্র জ্বর ও মাথাব্যথা
পেশী ব্যথা ও বমি বমি ভাব
গলা ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট (Pneumonia)
মারাত্মক ক্ষেত্রে এনসেফালাইটিস (Encephalitis) বা মস্তিষ্কের প্রদাহ, যা রোগীকে দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি তন্দ্রাচ্ছন্নতা বা চেতনার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কোমায় চলে যেতে পারেন। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার একটি শূকর খামারে প্রথম এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায় এবং পরে তা সিঙ্গাপুরেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
প্রতিরোধে করণীয় ও বৈশ্বিক প্রস্তুতি
যেহেতু নিপাহ ভাইরাসের কোনো স্বীকৃত চিকিৎসা নেই, তাই প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। কাঁচা খেজুরের রস পান করা, বাদুড়ে খাওয়া ফল ভক্ষণ এবং আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এশিয়ার দেশগুলো এখন তাদের ‘সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম’ (Surveillance System) শক্তিশালী করার মাধ্যমে ভাইরাসের আন্তঃদেশীয় সংক্রমণ ঠেকানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের এই ‘আউটব্রেক’ (Outbreak) বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য নতুন এক সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।