বিশ্ব ফুটবলের উদীয়মান শক্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও চিনা ফুটবল এখন জর্জরিত অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি আর অনিয়মের কালো ছায়ায়। ম্যাচ গড়াপেটা (Match-fixing) ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগে এবার বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে চিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (CFA)। এই অভিযানের অংশ হিসেবে জাতীয় দলের সাবেক প্রধান কোচ লি তিয়েসহ মোট ৭৩ জন ফুটবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া চিনা ফুটবলের শীর্ষ সারির ১৩টি পেশাদার ক্লাবের ওপর পয়েন্ট কর্তন ও বিশাল অঙ্কের জরিমানার খড়্গ নেমে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সিএফএর পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই ঐতিহাসিক শাস্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ফুটবলের অঙ্গন থেকে কলঙ্ক মুছে ফেলে ‘শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, পরিবেশ পরিশুদ্ধ করা এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা (Fair Play) নিশ্চিত করতে’ এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আস্তাকুঁড়ে সাবেক জাতীয় কোচ ও শীর্ষ কর্তারা
আজীবন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় সবচেয়ে বড় নামটি হলো লি তিয়ে। এক সময়ের জনপ্রিয় এই এভারটন মিডফিল্ডার ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত চিনা জাতীয় দলের ডাগআউট সামলেছেন। তবে মাঠের সাফল্যের চেয়ে মাঠের বাইরের বিতর্কই তার ক্যারিয়ারের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, কোচ থাকাকালীন তিনি বড় অঙ্কের ঘুষ (Bribery) লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গত বছরের ডিসেম্বরে আদালত তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে।
শুধু লি তিয়ে নন, দুর্নীতির বিষবৃক্ষ ছড়িয়েছিল সিএফএর খোদ নীতি-নির্ধারণী পর্যায়েও। সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান চেন সুইয়ুয়ান ১ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার ঘুষ নেওয়ার দায়ে বর্তমানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, এই ৭৩ জন আর কখনোই চিনা ফুটবলের কোনো প্রশাসনিক বা কারিগরি পদে ফিরতে পারবেন না।
পয়েন্ট হারাল চাইনিজ সুপার লিগের শীর্ষ ক্লাবগুলো
ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ক্লাব পর্যায়েও নজিরবিহীন কঠোরতা দেখিয়েছে সিএফএ। ২০২৫ এবং ২০২৬ মৌসুমে চাইনিজ সুপার লিগের (CSL) দলগুলোর ওপর এই প্রভাব পড়বে। জানা গেছে, ২০২৫ মৌসুমে অংশ নিতে যাওয়া ১৬টি দলের মধ্যে ১১টি দলকেই বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
২০২৬ মৌসুম শুরু হলে তিয়ানজিন জিনমেন টাইগার এবং গত মৌসুমের রানার্সআপ সাংহাই শেনহুয়ার ১০ পয়েন্ট করে কেটে নেওয়া হবে। এছাড়া প্রতিটি ক্লাবকে ১০ লাখ ইউয়ান (প্রায় ১ লক্ষ ৪৪ হাজার মার্কিন ডলার) জরিমানা দিতে হবে। এমনকি লিগের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন সাংহাই পোর্ট এবং ঐতিহ্যবাহী বেইজিং গুয়ান ক্লাবেরও ৫ পয়েন্ট করে কেটে নেওয়া হয়েছে। এই শাস্তির ফলে ক্লাবগুলোর ‘মার্কেট ভ্যালু’ এবং স্পন্সরশিপের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সি জিন পিংয়ের দুর্নীতিবিরোধী যুদ্ধের প্রভাব
চিনা ফুটবলের এই টালমাটাল অবস্থা মূলত দেশটির প্রেসিডেন্ট সি জিন পিংয়ের দেশব্যাপী পরিচালিত ‘Anti-Corruption Campaign’-এর একটি অংশ। ফুটবল পাগল প্রেসিডেন্ট জিন পিং চেয়েছিলেন চীনকে একটি ফুটবল পরাশক্তিতে রূপান্তরিত করতে। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিপুল বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির কর্মকর্তা ও খেলোয়াড় অবৈধ জুয়া (Betting) ও গড়াপেটার সিন্ডিকেট গড়ে তোলে।
বিশ্লেষকদের মতে, সিএফএর এই ব্যাপক সংস্কার চিনা ফুটবলকে পুনর্গঠিত করতে সাহায্য করবে। তবে এত বড় বড় নাম এবং ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও জরিমানা আরোপের পর মাঠের ফুটবলে সাধারণ দর্শকদের আস্থা কতটা ফিরবে, তা নিয়ে এখনো বড় সংশয় রয়েছে। ফুটবলের হারানো গরিমা ফেরাতে ‘Governance’ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন চিনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।