মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক যন্ত্রে আবারও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অচলাবস্থা। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ফেডারেল বাজেট বা সরকারি তহবিল আইন প্রণয়ন নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় দেশটিতে শুরু হয়েছে ‘আংশিক শাটডাউন’ (Partial Shutdown)। স্থানীয় সময় শুক্রবার মধ্যরাত থেকে এই সংকট কার্যকর হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে দেশটির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল সংস্থার নিয়মিত কার্যক্রম। মূলত অভিবাসন নীতি এবং সম্প্রতি মিনিয়াপোলিসে কেন্দ্রীয় এজেন্টদের গুলিতে দুই নাগরিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতাই এই অচলাবস্থার মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মিনিয়াপোলিসের উত্তাপ ও সিনেটের নাটকীয় ভোট
মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল এজেন্টদের অভিযানে দুই মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে উত্তাল পুরো যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘটনার রেশ পড়েছে ওয়াশিংটনের ক্ষমতাধর উচ্চকক্ষ ‘সিনেট’-এও (US Senate)। শুক্রবার সন্ধ্যায় সরকারি অর্থায়নের একটি বিশেষ প্যাকেজ নিয়ে ভোটাভুটি হয়। সেখানে ৭১-২৯ ভোটে বিলটি পাস হলেও এতে একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। বিলটিতে ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট’ (ICE) এবং ‘কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন’ (CBP) সংস্কারের দাবিতে ‘হোমল্যান্ড সিকিউরিটি’ (DHS) বিভাগের তহবিল দুই সপ্তাহের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বিলম্বই মূলত শাটডাউনের পথ প্রশস্ত করেছে।
আইনসভার ছুটিতে বিপাকে প্রশাসনিক কার্যক্রম
সিনেটে বিল পাস হলেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিনিধি পরিষদ বা ‘হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস’ (House of Representatives)। পরিষদের সদস্যরা বর্তমানে ছুটিতে থাকায় আগামী সোমবারের আগে সেখানে ভোটাভুটি সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আইনগতভাবে সরকারি তহবিল ছাড় করার প্রক্রিয়াটি মাঝপথে আটকে যায়। শনিবার ভোর থেকেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করে দেশটির প্রতিরক্ষা (Defense), শিক্ষা (Education), স্বাস্থ্য (Health) এবং পরিবহন (Transportation) বিভাগসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল সংস্থায়। বাজেট বরাদ্দ না থাকায় এসব দপ্তরের কাজ আপাতত সীমিত বা আংশিক স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে।
অভিবাসন ইস্যু: ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের নতুন চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যে ‘ইমিগ্রেশন পলিসি’ বা অভিবাসন ইস্যুকে হাতিয়ার করে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছিলেন, সেটিই এখন তার দল ও প্রশাসনের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশজুড়ে তীব্র বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভ এবং অভিবাসন আইনের সংস্কারের দাবি রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছে। একদিকে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে মানবাধিকার ও আইন সংস্কারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়েই এই বাজেট জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
‘সুশৃঙ্খল শাটডাউন’ ও আগামীর শঙ্কা
হোয়াইট হাউসের ব্যবস্থাপনা ও বাজেট দপ্তর (OMB) সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে একটি ‘সুশৃঙ্খল শাটডাউন’ (Orderly Shutdown) পরিকল্পনা কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে। যদিও মার্কিন প্রশাসন দাবি করছে যে, এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং সোমবার প্রতিনিধি পরিষদ পুনরায় চালু হলেই সমাধান আসবে। তবে এর আগে গত অক্টোবরে দেশটি টানা ৪৩ দিনের দীর্ঘতম শাটডাউনের সাক্ষী হয়েছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর বর্তমান পরিস্থিতি দেশটির ‘ফিসকাল পলিসি’ (Fiscal Policy) বা রাজস্ব নীতির কাঠামোগত দুর্বলতাকেই আবারও বিশ্বের সামনে উন্মোচিত করেছে।
জনজীবনে প্রভাব ও অনিশ্চয়তা
আংশিক শাটডাউনের কারণে হাজার হাজার ফেডারেল কর্মচারীকে সাময়িকভাবে বিনা বেতনে ছুটিতে যেতে হতে পারে অথবা বেতন ছাড়াই কাজ চালিয়ে যেতে হতে পারে। এছাড়া পাসপোর্ট সেবা থেকে শুরু করে জাতীয় উদ্যানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণেও ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সোমবার প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশনে দুই রাজনৈতিক পক্ষ কোনো সম্মানজনক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না।