• আন্তর্জাতিক
  • ইরান নিয়ে ট্রাম্পের ‘গোপন ছক’, অন্ধকারে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা: সংঘাত নাকি সমঝোতা?

ইরান নিয়ে ট্রাম্পের ‘গোপন ছক’, অন্ধকারে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা: সংঘাত নাকি সমঝোতা?

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
ইরান নিয়ে ট্রাম্পের ‘গোপন ছক’, অন্ধকারে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা: সংঘাত নাকি সমঝোতা?

সামরিক তৎপরতার মাঝেও কূটনীতির ধোঁয়াশা; তেহরানের পালটা হুঁশিয়ারি আর চীন-রাশিয়াকে নিয়ে ইরানের নতুন সমীকরণ।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটনের রণকৌশল নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে জল্পনা তুঙ্গে, তখন এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ বা হামলা সংক্রান্ত অত্যন্ত স্পর্শকাতর পরিকল্পনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকেও গোপন রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের এই অবস্থানে একদিকে যেমন মিত্র দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে।

গোপন পরিকল্পনার রহস্য ও মিত্রদের ‘অন্ধকার’ রাখা

শনিবার (৩১ জানুয়ারি) ফক্স নিউজকে (Fox News) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, তা নিয়ে তিনি এখনই কোনো ছক প্রকাশ করবেন না। এমনকি উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ‘Security Partners’ হিসেবে পরিচিত, তাদেরও এই পরিকল্পনার বিস্তারিত জানানো হয়নি। নিরাপত্তার খাতিরেই এই গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে বলে দাবি ট্রাম্পের। তবে তিনি একইসঙ্গে জানিয়েছেন, খামেনি প্রশাসনের সঙ্গে কিছু স্তরে আলোচনা চললেও এর ভবিষ্যৎ এখনো পুরোপুরি অনিশ্চিত।

সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও ড্রেস্ট্রয়ার মোতায়েন

ট্রাম্প যখন সমঝোতার কথা বলছেন, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বা ‘Military Build-up’ চোখে পড়ার মতো। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “আমরা ওই অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক সম্পদ জোরদার করেছি। আশা করি তেহরান এমন কোনো প্রস্তাব নিয়ে আসবে যা গ্রহণযোগ্য।” এরই ধারাবাহিকতায় ইসরায়েলের লোহিত সাগর তীরবর্তী এইলাত বন্দরে নোঙর করেছে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি অত্যাধুনিক ‘Destroyer’। যদিও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী একে পূর্বপরিকল্পিত এবং নিয়মিত সামরিক সহযোগিতার অংশ বলছে, তবুও বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে একে তেহরানের প্রতি একটি শক্তিশালী ‘Strategic Signal’ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

চাপের মুখে আলোচনায় নারাজ তেহরান

ওয়াশিংটনের এই বহুমুখী চাপের বিপরীতে ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে এক ফোনালাপে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরান সংঘাত চায় না এবং কূটনীতিই তাদের প্রথম পছন্দ। তবে ওয়াশিংটনের কোনো ধরনের চাপ বা ‘Maximum Pressure’ নীতির মুখে তারা আলোচনার টেবিলে বসবেন না। পেজেশকিয়ান উল্টো অভিযোগ করেছেন যে, ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সম্মিলিতভাবে ইরানে অস্থিরতা ও বিভাজন সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।

পরমাণু সক্ষমতা ও প্রতিরোধের কৌশল

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে কথা বলেছেন দেশটির পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ এসলামি। তিনি দাবি করেছেন, কৌশলগত কারণে ইরানের এই মুহূর্তে কোনো ‘Nuclear Weapon’ বা পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োজন নেই। তার মতে, ইরানের বর্তমান সামরিক শক্তি এবং ‘Deterrence Power’ বা প্রতিরোধ ক্ষমতা যেকোনো বহিঃশত্রুর মোকাবিলায় যথেষ্ট। তবে দেশটির সেনাপ্রধান আমির হাতামি সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের কোনো ঘাঁটি বা জাহাজে হামলা হলে তার জবাব হবে অত্যন্ত কঠোর।

চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের নতুন সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যের এই টানটান উত্তেজনার মধ্যেই একটি নতুন মোড় নিয়েছে ইরানের সামরিক কূটনীতি। মধ্য-ফেব্রুয়ারিতে উত্তর ভারত মহাসাগরে চীন ও রাশিয়ার নৌবাহিনীর সঙ্গে এক বিশাল যৌথ মহড়ায় (Joint Naval Drill) অংশ নিতে যাচ্ছে ইরান। দেশটির নিয়মিত নৌবাহিনী এবং ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি (IRGC) এই মহড়ায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা যখন মিত্রদের কাছ থেকে তথ্য গোপন করছে, তখন ইরান চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিদের সঙ্গে নিয়ে একটি নতুন ‘Regional Bloc’ বা আঞ্চলিক জোট গঠনের বার্তা দিচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই দাবা খেলায় ট্রাম্পের পরবর্তী চাল কী হয় এবং তেহরান কীভাবে তার পাল্টা জবাব দেয়, তা দেখতে এখন তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব। তবে ‘Diplomacy’ এবং ‘Military Threat’-এর এই দ্বৈরথ যে অঞ্চলটিকে এক বিপজ্জনক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

Tags: middle east donald trump us military geopolitics red sea diplomatic standoff iran tension nuclear power naval drill israel security