দশম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ মাঠ গড়ানোর আগেই মাঠের বাইরের লড়াই চরম নাটকীয় রূপ নিয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—এই তিন প্রতিবেশী দেশের ত্রিমুখী দ্বন্দ্বে এখন টালমাটাল বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি (ICC)। টুর্নামেন্টে খেলতে ভারতে যেতে অস্বীকৃতি জানানোয় বাংলাদেশকে বাদ দেওয়া থেকে শুরু করে, ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা—সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে ক্রিকেট বিশ্ব। এই পরিস্থিতিতে খেলাধুলাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার জোরালো দাবি তুলেছেন ভারতের প্রখ্যাত কূটনীতিক ও কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর।
সংকটের সূত্রপাত ও পাকিস্তানের কঠোর অবস্থান
এবারের বিশ্বকাপের আয়োজক ভারত। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত ও রাজনৈতিক জটিলতায় বাংলাদেশ দলকে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আইসিসি। এর প্রতিবাদে শুরুতে পুরো বিশ্বকাপ বয়কটের (Boycott) হুমকি দিয়েছিল পাকিস্তান। শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেও, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিপক্ষে ১৫ ফেব্রুয়ারির হাই-ভোল্টেজ ম্যাচটি না খেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামাবাদ।
সম্প্রতি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (PCB) চেয়ারম্যান মহসিন নাকভির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের পরেই সরকারিভাবে জানানো হয়, পাকিস্তান দল বিশ্বকাপে অংশ নেবে ঠিকই, কিন্তু ভারতের মাটিতে ভারতের বিপক্ষে কোনো ম্যাচ খেলবে না তারা। মূলত বাংলাদেশের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং ভারতের ‘একতরফা’ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেই এই অবস্থান নিয়েছে পাকিস্তান।
শশী থারুরের কড়া সমালোচনা ও ‘ক্রিকেট কূটনীতি’
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান এই রাজনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব খেলার মাঠে পড়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শশী থারুর। বার্তা সংস্থা এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বিষয়টিকে ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেন। থারুর বলেন, "সত্যি বলতে, দুই পক্ষ থেকেই খেলাধুলাকে এভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আমি মনে করি না বাংলাদেশের ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতার সঙ্গে চুক্তি থেকে বঞ্চিত করা উচিত ছিল। রাজনীতির এই অহেতুক হস্তক্ষেপই মূল সমস্যা তৈরি করছে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া হয়তো কিছুটা আবেগপ্রবণ ছিল, কিন্তু সেটি বর্তমান বাস্তবতারই প্রতিফলন। এখন পাকিস্তানও সেই পথেই হাঁটছে। পুরো বিষয়টি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।" থারুর মনে করেন, ক্রিকেট কেবল একটি খেলা নয়, এটি মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির মাধ্যম। অথচ বর্তমানে এটি বিভাজনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জরুরি যোগাযোগের তাগিদ ও আইসিসির ভূমিকা
বিশ্ব ক্রিকেটের এই ‘ডেডলক’ (Deadlock) কাটাতে আইসিসি-কে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন থারুর। তাঁর মতে, আইসিসি-র উচিত একটি অভিন্ন মঞ্চ তৈরি করা যেখানে তিন দেশ সরাসরি কথা বলতে পারবে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, "আমাদের এখনই বোঝা দরকার যে, ক্রিকেট আমাদের একত্রিত করার মাধ্যম হওয়া উচিত। এই অর্থহীনতা (Nonsense) আর চলতে দেওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট সবার জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। এখনই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ (Communication) শুরু করা প্রয়োজন।"
শাস্তির মুখে পাকিস্তান? উত্তপ্ত আইসিসি
এদিকে, পাকিস্তানের ম্যাচ বয়কটের ঘোষণার পর নড়েচড়ে বসেছে আইসিসি। এনডিটিভি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে একটি জরুরি ‘হাই-লেভেল মিটিং’ (High-level Meeting) ডেকেছে সংস্থাটি। ধারণা করা হচ্ছে, টুর্নামেন্টের সূচি অনুযায়ী খেলতে অস্বীকার করায় পাকিস্তানের ওপর বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) বা আর্থিক জরিমানা আরোপ করা হতে পারে। ব্রডকাস্টার ও স্পন্সরদের বিপুল আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকায় আইসিসি এখন চরম চাপের মুখে।
ক্রিকেট প্রেমীদের প্রশ্ন এখন একটাই—খেলার মাঠে কি শেষ পর্যন্ত রাজনীতির জয় হবে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে কাটবে এই মেঘ? বিশ্ব ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যেকার এই কূটনৈতিক বরফ গলে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।