সৌদি প্রো লিগের মানচিত্রে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন তিনি। যার হাত ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ফুটবলে ‘গোল্ডেন এরা’ শুরু হয়েছিল, সেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোই কি এবার রিয়াদ ছাড়ার পথে? পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক দাবি অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। খবর অনুযায়ী, আল নাসর ক্লাবে বর্তমানে চরম অসুখী পাঁচবারের ব্যালন ডি'অর জয়ী এই মহাতারকা। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) আল রিয়াদের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ডার্বি ম্যাচে তিনি মাঠে নামতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন বলেও গুঞ্জন উঠেছে।
বিদ্রোহ নাকি ক্লান্তি: ধোঁয়াশা তুঙ্গে
চলতি মরসুমে ঘরোয়া শিরোপার দৌড়ে টিকে থাকতে আল নাসরের জন্য প্রতিটি ম্যাচই এখন ‘মাস্ট উইন’। কিন্তু এমন এক সন্ধিক্ষণে রোনালদোর অনুপস্থিতির সম্ভাবনা ক্লাব কর্মকর্তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। প্রাথমিকভাবে দাবি করা হয়েছিল, টানা খেলার ধকল সামলাতে ৪০ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে বিশ্রাম দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ, ‘Physical Management’-এর অংশ হিসেবেই তাঁকে সাইডলাইনে রাখা হবে।
তবে পর্তুগিজ খ্যাতনামা দৈনিক ‘আ বোলা’ (A Bola) এই তথ্য উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, রোনালদোর এই সম্ভাব্য অনুপস্থিতির নেপথ্যে শারীরিক কোনো কারণ নেই, বরং এটি ক্লাবের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের ওপর তাঁর পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
বৈষম্যের অভিযোগ: পিআইএফ (PIF) ও আল হিলাল ফ্যাক্টর
রোনালদোর অসন্তোষের মূলে রয়েছে সৌদি আরবের ‘Public Investment Fund’ (PIF)। সৌদি আরবের শীর্ষ চারটি ক্লাব এই ফান্ডের অধীনে পরিচালিত হলেও রোনালদোর বিশ্বাস, আল নাসরের তুলনায় আল হিলালকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে লিগ টেবিলের শীর্ষে থাকা আল হিলাল যেভাবে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করছে, তার তুলনায় আল নাসরকে ‘সাদামাটা’ মনে করছেন পর্তুগিজ অধিনায়ক।
বিশেষ করে শীতকালীন দলবদলের বাজারে (Winter Transfer Window) স্কোয়াড শক্তিশালী করতে কোচ জর্জে জেসুস কোনো বড় অংকের আর্থিক সহায়তা পাননি। এখন পর্যন্ত ক্লাবের একমাত্র সংযোজন ২১ বছর বয়সী তরুণ ইরাকি মিডফিল্ডার হায়দার আবদুলকারিম, যা রোনালদোর মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী ফুটবলারের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
ক্ষমতার কোন্দল ও বেনজেমা বিতর্ক
প্রতিবেদনে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। আল নাসরের স্পোর্টিং ডিরেক্টর সিমাও কৌতিনহো এবং সিইও জোসে সেমেদো—যাঁরা রোনালদোর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, তাঁদের কার্যক্ষমতা চলতি মাসের শুরুতেই খর্ব করেছে ক্লাব বোর্ড। নিজের বিশ্বস্ত লোকদের এভাবে ‘ক্ষমতাহীন’ হতে দেখে রোনালদো ম্যানেজমেন্টের ওপর রীতিমতো বিরক্ত।
পাশাপাশি, রিয়াল মাদ্রিদের প্রাক্তন সতীর্থ করিম বেনজেমাকে নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন টানাপোড়েন। গুঞ্জন রয়েছে, আল ইত্তিহাদ ছেড়ে বেনজেমা আল হিলালে যোগ দিতে পারেন। রোনালদো এই দলবদলের তীব্র বিরোধিতা করছেন। তাঁর মতে, লিগের সেরা সব তারকাকে একটি নির্দিষ্ট ক্লাবে জড়ো করা হলে ‘Fair Competition’ বা ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট হবে।
কোচ জেসুসের ‘রাজনৈতিক ক্ষমতা’ মন্তব্য
রোনালদোর এই অসন্তোষের প্রতিধ্বনি শোনা গেছে কোচ জর্জে জেসুসের কণ্ঠেও। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে জেসুস মন্তব্য করেছিলেন যে, তাঁর বর্তমান ক্লাব আল নাসরের ‘আল হিলালের মতো রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই’। এই মন্তব্যের জেরে জেসুসকে নিষিদ্ধ করার দাবিও তুলেছে আল হিলাল কর্তৃপক্ষ। রোনালদো পূর্ণমাত্রায় তাঁর কোচের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন, যা ক্লাবের অভ্যন্তরীণ ফাটলকেই স্পষ্ট করে।
সংকটে সৌদি লিগের ভাবমূর্তি
২০২৭ সাল পর্যন্ত আল নাসরের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করা রোনালদো সৌদি আরবের ফুটবলের পোস্টার বয়। তিনি কেবল একজন খেলোয়াড় নন, বরং সৌদি লিগের বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ড ভ্যালু (Brand Value) বৃদ্ধির প্রধান কারিগর। এমন একজন আইকনিক ব্যক্তিত্ব যদি ‘ধর্মঘট’ বা বয়কটের পথে হাঁটেন, তবে তা বিশ্বজুড়ে এই লিগের অর্জিত সুনামে বড় ধাক্কা দেবে। সৌদি প্রো লিগ কর্তৃপক্ষ এখন রোনালদোকে শান্ত করতে কোনো বড় ‘সারপ্রাইজ’ বা নতুন কোনো কৌশল গ্রহণ করে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।