যাত্রাপথের আনন্দগান: এক ব্যতিক্রমী পরিবেশনা
বেঙ্গল শিল্পালয়ে অনুষ্ঠিত এই ব্যতিক্রমী আসরে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির ভেতরের দর্শন এবং তাঁর সৃজনশীল পথচলার বাঁকগুলোকে নিপুণভাবে তুলে ধরেন শিল্পী ফাহিম হোসেন চৌধুরী, সঞ্চিতা রাখি এবং স্বীকৃতি প্রসাদ বড়ুয়া। তাঁদের পরিবেশনায় যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন গৌতম কুমার সরকার, রবিন্স চৌধুরী, অশোক কুমার সরকার, মো. নাসির উদ্দীন এবং ওস্তাদ মো. মনিরুজ্জামান।
কৈশোরের অনুভূতি থেকে জীবনের জিজ্ঞাসা
অনুষ্ঠানের শুরুতেই দর্শক-শ্রোতাদের রবীন্দ্রনাথের কৈশোরের সময়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ভানুসিংহের পদাবলী থেকে নেওয়া 'গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে' গানটি দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। গানটির কথায় ভালোবাসার মানুষ চোখের আড়ালে থাকলেও বিশ্বাস যেন হারিয়ে না যায়, সেই গভীর অনুভূতিটি প্রকাশ পায়, যা পুরো আসরের ছন্দ ধরে রাখে। এরপর পরিবেশিত হয় 'মাঝে মাঝে তব দেখা পাই'। জীবনের চলার পথে ক্ষণিকের জন্য অপ্রত্যাশিতভাবে কাউকে দেখতে পাওয়ার আনন্দই এই গানটির মূল কথা। আলো যেমন হঠাৎ এসে আবার মিলিয়ে যায়, তেমনি এই গানটিও পথচলার মাঝখানে পাওয়া একমুহূর্তের উজ্জ্বলতাকে তুলে ধরে।
দ্বিধা ও আস্থার প্রকাশ
সঞ্চিতা রাখির কণ্ঠে পরবর্তী পরিবেশনা ছিল 'হৃদয়ের একূল ওকূল'। মানুষ যখন জীবনের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে পড়ে—না পারে ফিরে যেতে, না পারে সামনে এগোতে—ঠিক সেই দ্বিধার জায়গাটাকেই এই গান সহজ ভাষায় প্রকাশ করে। দুই তীরের মাঝখানে দাঁড়িয়েও যে বিশ্বাস রাখা যায়, সেই অটুট আস্থার কথাই এখানে ধরা পড়ে। এরপরের পরিবেশনা 'আজি যত তারা তব আকাশে' মনে করিয়ে দেয় যে চারপাশে অন্ধকার থাকা সত্ত্বেও আকাশে তারা জ্বলে আছে, তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আলো এবং আশা এখনো বিদ্যমান।
আনন্দের গভীর উপলব্ধি
এরপর 'কোথা হতে বাজে' গানটি যেন শ্রোতাদের এক গভীর উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়। এটি জীবনের আনন্দ কোথা থেকে আসে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করে। এই ভাবনারই আরও বিস্তার ঘটে 'জগতে আনন্দ যজ্ঞে' গানে। এখানে আনন্দ কোনো ব্যক্তিগত বা তাৎক্ষণিক অনুভূতি নয়, বরং কাজ, সৃষ্টি ও চলমানতার সঙ্গে যুক্ত থাকার মাধ্যমেই জীবনের প্রকৃত আনন্দ নিহিত—সেই বার্তাই দেওয়া হয়।
ফাহিম হোসেন চৌধুরীর পরিবেশনায় একের পর এক আসে 'নয়ন ছেড়ে গেলে চলে', 'তাই তোমার আনন্দ আমার এ পথ', 'আমি আছি তোমার সভার', 'আমায় থাকতে দে', 'সেই ভালো সেই ভালো', এবং 'দিনের শেষে ঘুমের দেশে' গানগুলো। নির্বাচিত প্রতিটি গানের আগে তার পেছনের গল্প ও কবিতার পাঠ দর্শক-শ্রোতাদের সঙ্গে পরিবেশনার এক নিবিড় সংযোগ স্থাপন করে। এই আয়োজনে গান শুধু শোনা হয়নি, গান হয়ে উঠেছে জীবনের কথা বলার এক সহজ ভাষা।
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিজীবনকে কোনো নির্দিষ্ট বয়সের গণ্ডিতে আটকে না রেখে, তাকে এক দীর্ঘ আধ্যাত্মিক যাত্রা হিসেবে দেখার এই প্রয়াস, 'যাত্রাপথের আনন্দগান', সেদিন উপস্থিত শ্রোতাদের জন্য নিঃসন্দেহে এক স্মরণীয় সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। এখানে গান শুধু সুর নয়, গানই যেন পথ, আর সেই পথের নামই আনন্দ।