বাংলাদেশি চলচ্চিত্র জগতের দিকপাল এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্বদা সক্রিয়। সমসাময়িক রাজনীতি এবং সমাজব্যবস্থা নিয়ে তার বিশ্লেষণধর্মী পোস্টগুলো প্রায়শই জনমনে গভীর রেখাপাত করে। এবার মহান একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শ্রদ্ধা নিবেদন এবং সেখানে মোনাজাত পরিচালনা নিয়ে নিজের সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত করেছেন তিনি। ফারুকীর মতে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তারেক রহমান মূলত শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের পথেই হাঁটছেন।
ঐতিহাসিক মোনাজাত ও বর্তমানের মেলবন্ধন
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক হ্যান্ডেলে ফারুকী একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি ১৯৫৩ সালের একটি ঐতিহাসিক ছবির প্রসঙ্গ টেনে আনেন, যেখানে দেখা যায় প্রভাতফেরি শেষে মানুষ শহীদ মিনারে মোনাজাত করছে। তিনি জানান, ফাহাম আব্দুস সালামের সৌজন্যে পাওয়া সেই ছবিটির টীকা এবং প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান কর্মকাণ্ডের মধ্যে তিনি এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছেন।
ফারুকী লেখেন, "গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ মিনারে মোনাজাত আদায় করলেন। অনেক দিন ধরে শুনতেছিলাম, তারেক রহমান এখন আর জিয়াউর রহমানের লাইনে নাই। আমি তো দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর উনি পরিষ্কার প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পথেই হাঁটছেন।"
জিয়াউর রহমানের দর্শনের পুনঃপাঠ
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শ বা ‘Zia’s Ideology’ ঠিক কী ছিল, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফারুকী এক অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ‘Inclusive’ রাষ্ট্রকাঠামোর কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, জিয়াউর রহমানের পথ ছিল এমন এক রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলা, যেখানে ধর্মীয় আচার এবং জাতীয় সংস্কৃতি সমান্তরালে অবস্থান করবে।
ফারুকীর মতে, "জিয়াউর রহমানের পথটা কী? সেটা হইলো আমাদের ধর্মীয় পরিচয়-আচার-রীতি না লুকাইয়াই আমরা একটা বহু জাতি-বহু ধর্ম-বহু ভাষার মানুষের ‘Republic’ বানাইতে পারি। যেই রিপাবলিকের মানুষ শহীদ মিনারে ফুল দেয়, চাইলে মোনাজাত পড়তে পারে, আবার গাইতেও পারে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...’।"
সাংস্কৃতিক সংকট ও ইতিহাসের নির্মোহ প্রশ্ন
ফারুকী তার পোস্টে একটি গভীর প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের প্রতি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন এবং কার স্বার্থে শহীদ মিনার কেন্দ্রিক আমাদের এই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংমিশ্রণকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। তার মতে, শহীদ মিনারে মোনাজাত করার বিষয়টিকে ‘Collective Memory’ বা সামষ্টিক স্মৃতি থেকে সরিয়ে দেওয়া বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সংকটের অন্যতম কারণ।
তিনি আরও যোগ করেন, এমন একটি রাষ্ট্র বা ‘Republic’ গড়া প্রয়োজন যা কোনো নির্দিষ্ট মহলের ‘Hegemonic Purpose’ বা আধিপত্যবাদী উদ্দেশ্য সাধন করবে না। বরং তা হবে আত্মপরিচয় সমৃদ্ধ এমন এক রাষ্ট্র, যার নাগরিকরা স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে গর্ব করবে এবং প্রয়োজন হলে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মতো বিপ্লব ঘটিয়ে স্বাধীনতা রক্ষার সংকল্প রাখবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে ফারুকীর পোস্ট
মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর এই পর্যবেক্ষণ বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP) যখন রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলছে, তখন জাতীয় প্রতীকের সঙ্গে ধর্মীয় আচারের এই মেলবন্ধন একটি নতুন ‘Political Narrative’ তৈরি করতে পারে। ফারুকীর এই পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে নেটিজেনরা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ও রাজনৈতিক উত্তরণ নিয়ে নিজেদের মতামত বিনিময় করছেন।