ফুটবল ইতিহাসের সেই চিরচেনা আবেগের বৃত্ত সম্পূর্ণ হতে চলেছে? যে শহর থেকে তেরো বছর বয়সে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে বার্সেলোনার পথে পাড়ি জমিয়েছিলেন, সেই রোজারিওতেই কি ফিরবেন ফুটবল জাদুকর? লিওনেল মেসির শৈশবের ক্লাব নিওয়েলস ওল্ড বয়েজ এখন কেবল একটি স্বপ্ন নয়, বরং ২০২৭ সালে মেসিকে ফেরাতে গ্রহণ করেছে এক সুদূরপ্রসারী ও মহাপরিকল্পিত উদ্যোগ। বিশ্ব ফুটবলের এই অবিসংবাদিত নায়ককে ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে নিজের আঙিনায় ফেরাতে একটি ‘সমন্বিত প্রজেক্ট’ (Integrated Project) নিয়ে কাজ শুরু করেছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ।
রোজারিওতে ‘মেসি ম্যানিয়া’: কেবল একটি ক্লাব নয়, যুক্ত হচ্ছে পুরো দেশ
নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের সহ-সভাপতি হুয়ান ম্যানুয়েল মেদিনা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মেসিকে ফিরিয়ে আনা কেবল নিওয়েলসের একক কোনো লক্ষ্য নয়। এই প্রকল্পের পেছনে রোজারিও শহর, সংশ্লিষ্ট প্রদেশ এবং সামগ্রিকভাবে আর্জেন্টিনার ফুটবল ফেডারেশন জড়িত রয়েছে। মেদিনার ভাষায়, “আমাদের লক্ষ্য হলো মেসির এই প্রত্যাবর্তনকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া, যার প্রভাব মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ‘গ্লোবাল ইমপ্যাক্ট’ তৈরি করবে।”
ইন্টার মায়ামি বনাম নিওয়েলস: চুক্তির মারপ্যাঁচ ও বাস্তবতা
বর্তমানে লিওনেল মেসি যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকার (MLS)-এর ক্লাব ইন্টার মায়ামির সাফল্যের মধ্যমণি। ২০২৩ সালে ক্লাবটিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি একের পর এক শিরোপা জিতে চলেছেন। লিগস কাপ, সাপোর্টার্স শিল্ড এবং সর্বশেষ এমএলএস কাপ জয়ের মাধ্যমে মায়ামিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। গত অক্টোবরেই মেসির সাথে মায়ামির চুক্তির মেয়াদ ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে নিওয়েলসের পরিকল্পনা হলো ২০২৭ সালের প্রথমার্ধেই তাকে লিগ ওয়ান বা ইউরোপীয় ফুটবলের বাইরে লাতিন আমেরিকার উত্তপ্ত ফুটবল আঙিনায় ফিরিয়ে আনা।
অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি
৩৮ বছর বয়সী মেসির মতো একজন বৈশ্বিক ‘আইকন’-কে ধারণ করার ক্ষমতা বর্তমান নিওয়েলসের আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আর সে কারণেই ক্লাবটি তাদের অবকাঠামো (Infrastructure) উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক সংহতি বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছে। মেদিনা স্পষ্ট করেছেন যে, মেসির জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে শক্তিশালী ভিত গড়া হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো এমন এক ‘কম্পিটিটিভ টিম’ গঠন করা, যেখানে মেসি স্বাচ্ছন্দ্যে তার পায়ের জাদু প্রদর্শন করতে পারেন।
আবেগ বনাম পেশাদারিত্ব: সম্ভাব্য ইতিহাস
সূত্র মতে, মেসির ঘনিষ্ঠ মহলের সাথে ইতোমধ্যেই অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রাথমিক আলোচনা (Informal Talks) সেরে রেখেছে ক্লাবটি। যদিও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এখনও আসেনি। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির খেলার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। বিশ্বকাপের সেই মহাযজ্ঞ শেষ করার পর, ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টি নিজের শৈশবের ক্লাবে কাটানো হবে ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগপূর্ণ ‘ফেয়ারওয়েল’ বা বিদায়।
নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের ভক্তরা এখন প্রহর গুনছেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য, যখন রোজারিওর ছেলে রোজারিওতেই ফিরবেন। ফুটবল বিশ্বে এই সম্ভাব্য স্থানান্তর কেবল একটি ট্রান্সফার নিউজ নয়, বরং এটি একটি বৃত্ত পূরণের গল্প—যা ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে দীর্ঘকাল দাগ কেটে থাকবে।
tags