মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নাটকীয় মোড় নিয়ে শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ওমানের রাজধানী মাসকাটে মুখোমুখি হচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দীর্ঘ নয় মাস পর দেশ দুটির মধ্যে আনুষ্ঠানিক ‘নিউক্লিয়ার টক’ (Nuclear Talk) বা পারমাণবিক আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। তবে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগেই তেহরানে অবস্থানরত নিজ নাগরিকদের অবিলম্বে ইরান ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক পদক্ষেপে নতুন করে যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
কেন এই জরুরি প্রস্থান? ভার্চুয়াল দূতাবাসের সতর্কবার্তা
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোনো দূতাবাস নেই, তবে তাদের ‘ভার্চুয়াল দূতাবাস’ (Virtual Embassy) মার্কিন নাগরিকদের জন্য একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সতর্কতা জারি করেছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান ‘সিকিউরিটি রিস্ক’ (Security Risk), যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর কড়াকড়ি এবং অনিশ্চিত পরিবহন ব্যবস্থার কারণে মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা মারাত্মক বিঘ্নিত হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নাগরিকদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে তারা যেন মার্কিন সরকারের কোনো বিশেষ সহায়তার ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অবিলম্বে ইরান ত্যাগ করেন। একদিকে আলোচনার টেবিলে বসার প্রস্তুতি, অন্যদিকে নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার এই সংকেত মধ্যপ্রাচ্যে কোনো বড় সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
মাসকাট বৈঠক: মুখোমুখি কুশনার ও আরাঘচি
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই বৈঠকে দুই দেশের প্রতিনিধি দলেই থাকছেন হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিরা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইতিমধ্যেই ওমান পৌঁছেছেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের প্রভাবশালী জামাতা জ্যারেড কুশনার মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, কুশনারের উপস্থিতি এই আলোচনাকে ভিন্ন মাত্রা দিচ্ছে, যা কেবল পারমাণবিক ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।
দ্বিমুখী অবস্থান ও বোমা হামলার হুমকি
আলোচনার সূচি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। ওয়াশিংটন চাচ্ছে ইরানের ‘নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম’ (Nuclear Program) পুরোপুরি স্থগিত করা এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ (Uranium Stockpile) উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করা। এর পাশাপাশি ইরানের ‘ব্যালিস্টিক মিসাইল’ (Ballistic Missile) কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন নিয়েও কঠোর শর্তারোপ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
তবে ইরান শুরু থেকেই অনড় অবস্থানে রয়েছে। তাদের দাবি, আলোচনা হতে হবে শুধুমাত্র পারমাণবিক কর্মসূচির সীমাবদ্ধতার মধ্যে; অভ্যন্তরীণ নীতি বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এখানে আলোচনার বিষয় হতে পারে না। এই মতপার্থক্য নিরসনের বদলে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, খুব দ্রুত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে ইরানের ওপর ভয়াবহ ‘বোমা হামলার’ (Bombing Threat) নির্দেশ দিতে পারেন তিনি। পাল্টা জবাব হিসেবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্য ও ইসরায়েলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা বা ‘মিলিটারি অ্যাসেট’ (Military Assets) ধ্বংস করার হুমকি দিয়ে রেখেছে।
কূটনৈতিক পথ নাকি সামরিক সংঘাত?
ওমানের মধ্যস্থতায় এই আলোচনাকে অনেকেই উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। ইরানের ওপর চলমান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদি শুক্রবারের এই আলোচনা কোনো ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামোর দিকে না এগোয়, তবে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শীতল লড়াই সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
একদিকে আলোচনার টেবিল আর অন্যদিকে যুদ্ধবিমানের গর্জন—মাসকাটের এই হাই-ভোল্টেজ বৈঠকের ফলাফলের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্ব।